প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানের রাজধানী তেহরানের ঐতিহাসিক গোলেস্তান প্রাসাদ সাম্প্রতিক সহিংস সংঘর্ষে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। ইউনেসকোসহ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই ঘটনার প্রতি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গোলেস্তান প্রাসাদ ইউনেসকোর স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত এবং ইরানের রাজকীয় ইতিহাস ও স্থাপত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তেহরানের আরগ স্কয়ারের কাছে প্রাসাদের কাছে একটি বিস্ফোরণ ঘটেছে, যার ফলে প্রাসাদের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গোলেস্তান প্রাসাদ মূলত কাজার রাজবংশের সময় নির্মিত হয়েছিল এবং তখন এটি ইরানি রাজাদের সরকারি রাজকীয় বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পরে এটি পাহলভি রাজবংশের সরকারি আসন হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং ইরানের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রাসাদের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য, শিলালিপি, মূর্তিকলা ও নকশা যুগ যুগ ধরে পর্যটক ও ইতিহাসপ্রেমীদের আকৃষ্ট করে আসছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তেহরানের এই বিস্ফোরণ গোলেস্তান প্রাসাদসহ আশেপাশের ঐতিহাসিক স্থাপনার ক্ষতির কারণ হয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যও শংকাজনক একটি বিষয়, কারণ এটি শুধু ইরানের নয়, পুরো বিশ্বের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ক্ষতি হিসেবে ধরা হবে। ইউনেসকোর বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পদকে সুরক্ষিত রাখা আবশ্যক। বিশেষ করে ১৯৫৪ সালের হেগ কনভেনশন এবং ১৯৭২ সালের বিশ্ব সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ কনভেনশন অনুযায়ী যেকোনো সংঘর্ষের সময় ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।
উল্লেখযোগ্য যে, গোলেস্তান প্রাসাদ শুধু স্থাপত্যশিল্পের নিদর্শন নয়, এটি ইরানের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের সাক্ষী। কাজার রাজবংশের সময় এটি রাজকীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়, পরবর্তীতে পাহলভি রাজবংশের শাসনকালেও প্রাসাদ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র ছিল। তাই এই প্রাসাদের ক্ষতি শুধু ইরানের জন্য নয়, বিশ্বের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্যও বড় ধাক্কা।
স্থানীয় নাগরিক ও ইতিহাসপ্রেমীরা বলছেন, প্রাসাদের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। প্রাসাদের অঙ্গসংস্থান, বাগান, রাজকীয় মিলনমেলা, শিলালিপি ও নকশা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে তা পর্যটক ও গবেষক উভয়ের জন্য চরম ক্ষতি। এছাড়া, প্রাসাদের স্থাপত্য ও নকশার মধ্যে থাকা সূক্ষ্ম মূর্তিকলা ও স্থাপত্যশিল্পের নিদর্শন অনেকাংশে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বব্যাপী বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ বাহিনীর মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে ঐতিহাসিক স্থানগুলোতে এই ধরনের ক্ষতি আরও বাড়তে পারে। গোলেস্তান প্রাসাদের ঘটনা একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য তৎপর করতে বাধ্য করছে।
ইরানের সংস্কৃতি ও ইতিহাস সংরক্ষণে সরকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ইউনেসকোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যেকোনো আক্রমণ বা সংঘর্ষের সময় ঐতিহ্যবাহী ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে এবং দায়ী পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনা হবে। তাই বিশ্ব সম্প্রদায়কে সক্রিয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
গোলেস্তান প্রাসাদের ক্ষতি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু একটি ইতিহাস ও সংস্কৃতির ক্ষতি নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ইরান ও অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্য দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনাকে আরও ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন।
গোলেস্তান প্রাসাদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটন ও আন্তর্জাতিক পর্যটনেও প্রভাব পড়বে। তেহরানের ঐতিহাসিক স্থানগুলোতে আগমনকারী পর্যটকরা প্রাসাদের মূল সৌন্দর্য ও ইতিহাস সরাসরি দেখতে পাবেন না। ফলে এটি শুধু সাংস্কৃতিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও প্রভাব ফেলতে পারে।
ইতিহাস ও স্থাপত্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাসাদের সংস্কার ও পুনঃস্থাপন কার্যক্রম দ্রুত শুরু না হলে এর নিদর্শনগুলো স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই প্রাসাদের ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলোর অবিলম্বে জরুরি মেরামত ও সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার আহ্বান জানানো হচ্ছে।