১৪ দিনের জ্বালানি তেল মজুত, আতঙ্কের কারণ নেই

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০২৬
  • ৪০ বার
দেশে জ্বালানি তেলের মজুত পরিস্থিতি

প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে জ্বালানি তেলের মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে চলমান উদ্বেগের মধ্যেই আশ্বস্ত করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। সংস্থাটি জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে এবং নিকট ভবিষ্যতে সরবরাহ সংকট বা মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা নেই। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে মোট প্রায় এক লাখ ছত্রিশ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে, যা স্বাভাবিক চাহিদা পূরণে সক্ষম। বৈশ্বিক অস্থিরতা ও সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি মাথায় রেখে জ্বালানি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

তিনি জানান, বর্তমানে মজুত থাকা ডিজেল দিয়ে প্রায় চৌদ্দ দিন চাহিদা পূরণ সম্ভব। একই সঙ্গে অকটেন আটাশ দিন, পেট্রোল পনের দিন, ফার্নেস তেল তিরানব্বই দিন এবং জেট জ্বালানি পঞ্চান্ন দিন পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে। এই হিসাব দেশের বিদ্যমান দৈনিক চাহিদা ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ধারাবাহিকভাবে আমদানির কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সোমবার পর্যন্ত সাতটি জাহাজের আমদানি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং এগুলো ধাপে ধাপে দেশে পৌঁছাবে। ফলে বিদ্যমান মজুতের পাশাপাশি নতুন সরবরাহ যুক্ত হওয়ায় বাজারে কোনো ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সংঘাত ও মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। অনেক দেশ জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে জ্বালানি সংকট বা মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হলেও বিপিসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

চেয়ারম্যান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ওঠানামা অব্যাহত থাকলেও সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। প্রয়োজন হলে বিকল্প বাজার থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হবে। একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখী সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে বৈশ্বিক কোনো সংকট দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে না পারে।

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে জ্বালানি সরবরাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং কৃষি কার্যক্রম সরাসরি জ্বালানি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। ফলে মজুত পরিস্থিতি নিয়ে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশের বিভিন্ন ডিপো ও সংরক্ষণাগারে নিয়মিতভাবে মজুত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের বিঘ্ন যেন না ঘটে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করছে। তেল পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থায় আধুনিকীকরণ কার্যক্রমও ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

এ সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিপিসি চেয়ারম্যান বলেন, বাজারে অযৌক্তিক আতঙ্ক তৈরি হলে কখনও কখনও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়। তাই জনগণকে গুজবে কান না দিয়ে সরকারি তথ্যের ওপর নির্ভর করার আহ্বান জানান তিনি। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, বর্তমান মজুত পরিস্থিতি বিবেচনায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কোনো চাপ নেই।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তার সময় আগাম পরিকল্পনা এবং পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়িয়েছে, যা এখন সংকট মোকাবিলায় সহায়ক ভূমিকা রাখছে। দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিকল্প উৎসের দিকেও নজর বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

সরকারি সূত্রগুলো বলছে, জ্বালানি সরবরাহে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সমুদ্রবন্দর ও স্থলবন্দরগুলোতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। আমদানিকৃত জ্বালানি দ্রুত খালাস ও বিতরণের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যাতে কোনো পর্যায়ে বিলম্ব না ঘটে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় নতুন সংরক্ষণ অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

দেশের জ্বালানি খাত নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ সব সময়ই বেশি থাকে, কারণ এটি সরাসরি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। পরিবহন ভাড়া থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম—সবকিছুতেই জ্বালানি খরচের প্রভাব রয়েছে। তাই জ্বালানি মজুত নিয়ে আশ্বস্ত করা সংবাদ সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়ে তথ্যের স্বচ্ছতা ও দ্রুত যোগাযোগ বাজারে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। বিপিসির সাম্প্রতিক ঘোষণা সেই দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন ব্যবসায়ী ও শিল্পখাত আশ্বস্ত হয়েছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও আস্থা তৈরি হয়েছে যে দেশের জ্বালানি সরবরাহ আপাতত নিরাপদ অবস্থায় রয়েছে।

সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও মজুত স্থিতিশীল রয়েছে বলে জানিয়েছে বিপিসি। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যেভাবেই পরিবর্তিত হোক না কেন, আগাম প্রস্তুতি ও বিকল্প পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত