কচুয়ায় ভয়াবহ আগুনে ৮ দোকান ছাই

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০২৬
  • ৩৮ বার
কচুয়ায় অগ্নিকাণ্ডে ৮ দোকান ভস্মীভূত

প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার ছোট আন্ধারমানিক বটতলা এলাকায় গভীর রাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে আটটি দোকান সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় ব্যবসায়ীরা কিছুই রক্ষা করতে পারেননি। প্রাথমিকভাবে প্রায় ২০ লক্ষাধিক টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের অধিকাংশই আন্ধারমানিক সোনাকুড় এলাকার বাসিন্দা, যারা দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বাজারে ছোট ছোট ব্যবসার মাধ্যমে পরিবার চালিয়ে আসছিলেন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, রাত আনুমানিক দুইটার দিকে একটি দোকান থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রথমে ধোঁয়া দেখা গেলেও কিছু বুঝে ওঠার আগেই আগুন তীব্র আকার ধারণ করে। আশপাশের টিন ও কাঠের তৈরি দোকানগুলোতে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। গভীর রাত হওয়ায় অনেকেই ঘুমিয়ে ছিলেন। আগুনের লেলিহান শিখা ও চিৎকারে আশপাশের মানুষ ছুটে আসেন, কিন্তু ততক্ষণে আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে রয়েছেন গ্যারেজ ব্যবসায়ী মিজান শেখ, দর্জি প্রশান্ত মৃধা, মুদি ব্যবসায়ী বাদশা সেখ, সিরাজুল শেখ, কাইউম ব্যাপারী, আলামীন শেখ ও আশিস মৃধা এবং ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায়ী আলামীন শেখ। প্রত্যেকেই জানিয়েছেন, তাদের দোকানে থাকা মালামাল, আসবাব, নগদ অর্থ এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সবকিছু আগুনে পুড়ে গেছে। অনেকের জীবনের সঞ্চয় ছিল এই দোকানেই। আগুনের পর ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে তারা যখন ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়ান, তখন চোখে ছিল হতাশা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।

ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা ফায়ার সার্ভিসে খবর দেন। তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, খবর দেওয়ার পরও ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেড় ঘণ্টার বেশি সময় নেয়। তাদের দাবি, সময়মতো পৌঁছালে অন্তত কয়েকটি দোকান রক্ষা করা যেত। বিলম্বের কারণে আগুন আরও ছড়িয়ে পড়ে এবং ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যায়। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ জনতা রাতেই ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে কর্মকর্তারা দ্রুত এলাকা ত্যাগ করেন।

তবে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দূরত্ব ও রাতের যোগাযোগ সমস্যার কারণে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লেগেছে। তারা আগুন নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন বলে দাবি করেন। এ বিষয়ে তদন্ত করে প্রকৃত কারণ ও বিলম্বের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাদ। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের দুঃখ-কষ্টের কথা শোনেন। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন থাকবে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। একই সময় উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরদার জাহিদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সমবেদনা জানান।

কচুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলী হাসান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে জরুরি খাদ্যসহায়তা ও কম্বল বিতরণ করেন। তার সঙ্গে কচুয়া থানার অফিসার ইনচার্জ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং সরকারিভাবে সহায়তার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।

স্থানীয়রা বলছেন, বাজার এলাকায় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। অনেক দোকানে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র নেই, বৈদ্যুতিক তারের সংযোগও অনিয়মিত। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। তবে এটি নিছক দুর্ঘটনা নাকি অন্য কোনো কারণ রয়েছে, তা তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আগুনে শুধু দোকান নয়, তাদের স্বপ্নও পুড়ে গেছে। কেউ ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন, কেউ আবার বছরের পর বছর সঞ্চয় করে দোকান গড়েছিলেন। এখন নতুন করে শুরু করার মতো পুঁজি তাদের হাতে নেই। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত আর্থিক সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা না করলে এসব পরিবার চরম সংকটে পড়বে।

সকালে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলে পুরো এলাকা জুড়ে দেখা যায় ছাই আর পোড়া টিনের স্তূপ। ধোঁয়ার গন্ধে ভারী হয়ে ছিল বাতাস। আশপাশের মানুষজন ভিড় করে ধ্বংসস্তূপ দেখতে আসেন। অনেকেই সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেন। কেউ খাবার নিয়ে আসেন, কেউবা সামান্য আর্থিক সহায়তা করেন। মানবিক এই সংহতি ক্ষতিগ্রস্তদের কিছুটা সাহস জুগিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামীণ ও মফস্বল বাজারগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। নিয়মিত বৈদ্যুতিক সংযোগ পরীক্ষা, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র স্থাপন এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে এমন ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন।

এই অগ্নিকাণ্ড কেবল আটটি দোকানের ক্ষতি নয়; এটি আটটি পরিবারের জীবিকার ওপর বড় আঘাত। তাদের সন্তানদের পড়াশোনা, পরিবারের চিকিৎসা ও দৈনন্দিন ব্যয়—সবকিছুই এখন অনিশ্চয়তার মুখে। দ্রুত পুনর্বাসন ও সহায়তা না পেলে তারা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে পারেন।

কচুয়ায় গভীর রাতের এই অগ্নিকাণ্ড স্থানীয়দের মনে আতঙ্ক ও শোকের ছাপ রেখে গেছে। তদন্তে প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনই এখন সবার প্রত্যাশা। প্রশাসন ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগেই কেবল এ ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত