প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলায় একটি সভাকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে সৃষ্ট আলোচনা-সমালোচনার প্রেক্ষাপটে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিটন দে ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহবুবুল আলমকে বদলি করা হয়েছে। সংসদ সদস্যের স্ত্রীকে একটি প্রশাসনিক সভায় প্রধান অতিথির আসনে বসানো নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পরপরই এ বদলির প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ায় ঘটনাটি নতুন করে জনমনে কৌতূহল ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
রোববার জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপনে লিটন দেকে সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে এবং মাহবুবুল আলমকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। সংশ্লিষ্ট আদেশে সই করেন সিলেট বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সংস্থাপন শাখার সিনিয়র সহকারী কমিশনার উম্মে সালিক রুমাইয়া এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ নিয়োগ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মুহাম্মদ তানভীর হাসান রুমান। প্রজ্ঞাপন জারির সময় ও ঘটনার সময়কাল নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৬ ফেব্রুয়ারি। সেদিন বাহুবল উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে প্রশাসনের আয়োজনে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রধান অতিথির আসনে বসেন হবিগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য রেজা কিবরিয়া–এর স্ত্রী সিমি কিবরিয়া। সভায় তিনি বক্তব্যও দেন। পরবর্তীতে ওই সভার একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে তীব্র আলোচনা শুরু হয়। ছবিতে দেখা যায়, সিমি কিবরিয়ার এক পাশে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিটন দে এবং অন্য পাশে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহবুবুল আলম ও বাহুবল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বসে আছেন।
সরকারি আয়োজনে অনুষ্ঠিত সভায় জনপ্রতিনিধির পরিবারের সদস্যের প্রধান অতিথির আসনে বসা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রশ্ন তোলা হয়। অনেকেই জানতে চান, প্রশাসনিক সভায় এ ধরনের উপস্থিতি ও ভূমিকার আইনি ভিত্তি কী। কেউ কেউ এটিকে শিষ্টাচার বহির্ভূত বলেও মন্তব্য করেন। আবার অনেকে এটিকে স্থানীয় পর্যায়ের সৌজন্য বৈঠক হিসেবে ব্যাখ্যা দেন।
সমালোচনার একদিন পরই ইউএনও ও এসিল্যান্ডের বদলির প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ায় বিষয়টি আরও আলোচিত হয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বদলিকে নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বলেই দাবি করেছেন। বাহুবল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, তিনি ইউএনওর আমন্ত্রণে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং এটি একটি সাধারণ পরিচিতি সভা ছিল। তার মতে, এতে বিশেষ কিছু ছিল না।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিটন দে জানান, বদলির সঙ্গে ওই ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে তার একবার বদলি হয়েছিল, পরে তা পরিবর্তিত হয়। এখন আবার বদলির আদেশ এসেছে, যা প্রশাসনের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। তার বক্তব্যে বোঝানো হয়, বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করার সুযোগ নেই।
হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফীনও একই ধরনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, এটি আনুষ্ঠানিক প্রশাসনিক বৈঠক ছিল না, বরং একটি পরিচিতি সভা। বদলির বিষয়টিও রুটিন প্রক্রিয়ার অংশ। একই সময়ে দুজন কর্মকর্তার বদলিকে তিনি কাকতালীয় বলে উল্লেখ করেন।
তবে এর আগেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল নবীগঞ্জ উপজেলায়। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সেখানে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ড. রেজা কিবরিয়ার সঙ্গে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিনের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন ড. রেজা কিবরিয়া। কিন্তু সভা শুরুর কিছুক্ষণ পর তিনি স্থান ত্যাগ করলে তার স্ত্রী সিমি কিবরিয়া প্রধান অতিথির আসনে বসেন এবং উপস্থিত কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন। ওই দিন তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সও পরিদর্শন করেন। সেই সময় স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা তার সঙ্গে ছিলেন।
দুই উপজেলার ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ চলছে। কেউ বলছেন, জনপ্রতিনিধির পরিবারের সদস্যের এ ধরনের অংশগ্রহণ স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রমে সহায়ক হতে পারে। আবার অন্যরা বলছেন, প্রশাসনিক প্রটোকল ও শিষ্টাচার বজায় রাখা জরুরি, যাতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি না হয়। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে যে কোনো প্রশ্ন জনআস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে বলেও মত দিচ্ছেন অনেকে।
প্রশাসনিক সূত্র বলছে, বদলি সরকারি চাকরির স্বাভাবিক অংশ। বিভিন্ন সময় প্রয়োজন ও নীতিমালার আলোকে কর্মকর্তাদের স্থানান্তর করা হয়। তবে জনমনে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করাই এ ক্ষেত্রে মূল চ্যালেঞ্জ।
ঘটনার পর বাহুবলে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ মনে করছেন, সামাজিক মাধ্যমের চাপেই বদলি হয়েছে। আবার কেউ বলছেন, এটি নিছকই কাকতালীয়। তবে প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘটনার সঙ্গে বদলির সম্পর্ক অস্বীকার করেছে।
সমগ্র পরিস্থিতি দেখলে বোঝা যায়, স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও প্রটোকল মেনে চলার বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক মাধ্যমের যুগে যেকোনো ছবি বা তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তা জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। ফলে প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে আরও সতর্কতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
সব মিলিয়ে বাহুবলের এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, তা স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে। বদলি আদেশ কার্যকর হওয়ার পর নতুন কর্মকর্তারা দায়িত্ব নেবেন। তবে আলোচনার রেশ আপাতত কাটছে না।