খামেনির পর ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৪ মার্চ, ২০২৬
  • ৫০ বার
প্রয়াত সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি।

প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। দেশটির দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন তার ছেলে মোজতবা খামেনি। বুধবার এ তথ্য প্রকাশ করে লন্ডনভিত্তিক ইরানীয় সংবাদমাধ্যম Iran International। খবরটি প্রকাশের পর থেকেই ইরানসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের ক্ষমতাধর সামরিক বাহিনী Islamic Revolutionary Guard Corps-এর প্রভাব ও চাপের মুখে দেশের সাংবিধানিক সংস্থা Assembly of Experts মোজতবা খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচন করে। যদিও রাষ্ট্রীয়ভাবে পূর্ণাঙ্গ বিবৃতি এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবে একাধিক আন্তর্জাতিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

৮৬ বছর বয়সী আলি খামেনি গত শনিবার সকালে এক হামলায় গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে তার মৃত্যুর খবর দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। কিছু আন্তর্জাতিক সূত্রের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত হামলার ফলেই এ ঘটনা ঘটে। যদিও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এখনো মেলেনি। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে এ ঘটনা নতুন করে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার জন্ম দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

১৯৮৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন আলি খামেনি। টানা ৩৬ বছর তিনি দেশটির ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। তার আমলে ইরান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিতর্ক, আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে উত্থান এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। সমর্থকদের কাছে তিনি ইসলামী বিপ্লবের আদর্শিক ধারার রক্ষক; সমালোচকদের কাছে তিনি কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক শাসনের প্রতীক।

তার মৃত্যুর পর উত্তরসূরি নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই জল্পনা চলছিল। মোজতবা খামেনির নাম আলোচনায় থাকলেও তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আনা হয়নি। তিনি আড়ালে থেকে ধর্মীয় শিক্ষা, নীতি নির্ধারণী আলোচনায় অংশগ্রহণ এবং প্রভাবশালী মহলে যোগাযোগ রক্ষার মাধ্যমে নিজস্ব অবস্থান সুদৃঢ় করেছিলেন বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কাঠামোয় তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল বলেও ধারণা করা হয়।

মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে ইরানের রাজনৈতিক গতিপথ কোন দিকে মোড় নেবে, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানে সর্বোচ্চ নেতা রাষ্ট্রের সামরিক, বিচারিক ও গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণী বিষয়ে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব রাখেন। নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করলেও মূল কৌশলগত সিদ্ধান্ত সর্বোচ্চ নেতার অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে নতুন নেতৃত্বের অবস্থান দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে।

এদিকে আলি খামেনির দাফনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ইরানের বার্তাসংস্থা Fars News Agency জানিয়েছে, তাকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ঐতিহাসিক নগরী মাশহাদ-এ দাফন করা হবে। শিয়া মুসলিমদের কাছে মাশহাদ একটি পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত। এখানেই অবস্থিত বিখ্যাত ইমাম রেজা মাজার, যা ইরানের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় তীর্থকেন্দ্র।

মাশহাদেই আলি খামেনির জন্ম হয়েছিল। জানা গেছে, মৃত্যুর আগে তিনি নিজেই ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন যেন তাকে ইমাম রেজা মাজার প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ইতোমধ্যে বহু মানুষ মাশহাদ ও রাজধানীতে সমবেত হতে শুরু করেছেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও নির্দিষ্ট সময় এখনো ঘোষণা করা হয়নি।

আলি খামেনির মৃত্যু এবং মোজতবা খামেনির উত্থান ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক বাহিনীর সমর্থন নতুন নেতৃত্বকে শক্তিশালী অবস্থান দিতে পারে। তবে উত্তরাধিকারসূত্রে ক্ষমতা হস্তান্তর ইরানের বিপ্লবী আদর্শের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। এর ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এ পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে পারে। পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার—সবকিছুতেই ইরানের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সর্বোচ্চ নেতা কেমন কৌশল গ্রহণ করবেন, তা নিয়ে বিশ্বরাজনীতিতে গভীর আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় এক নেতৃত্বের অধীনে থাকার পর ইরান এখন নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। শোক, অনিশ্চয়তা ও প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে দেশটির জনগণ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আগামী দিনগুলোতে মোজতবা খামেনির বক্তব্য, নীতি ও সিদ্ধান্তই ইরানের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত