প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানের রাজধানী তেহরানে নতুন করে ইসরায়েলি বিমান হামলা চালানো হয়েছে, যার ফলে শহরে একাধিক বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তেহরানের লক্ষ্যবস্তুতে ‘ব্যাপক বিমান হামলা’ শুরুর ঘোষণা দেওয়ার পরপরই এই বিস্ফোরণ ঘটেছে। হামলার প্রেক্ষাপটে ইরানের রাজধানীসহ আশেপাশের এলাকায় আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) মূলত ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে এই হামলা চালিয়েছে। বিস্ফোরণের ফলে ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ধারণকৃত ভিডিওতে ভবনগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসের চিত্র দেখা যাচ্ছে।
এর আগে মঙ্গলবার ইরানের ‘প্রধান নেতৃত্ব নির্ধারণী পর্ষদ’ ভবনে বড় ধরনের হামলা চালায় ইসরায়েল। বুধবার এই নতুন আক্রমণটি সেই হামলার ধারাবাহিকতা হিসেবে ধরা হচ্ছে। ইরানের কোম শহরে ধারণ করা দুটি ভিডিওতে দেখা যায়, ইসরায়েলি বিমান ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ এর সচিবালয় ভবন এবং পাশের একটি ভবন লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। আক্রমণকৃত ভবনটি বেশ পুরনো এবং বর্তমান অধিবেশনের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছিল না।
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ ৮৮ জন জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতা নিয়ে গঠিত। সম্প্রতি শনিবার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন ও নেতৃত্ব নির্ধারণের দায়িত্ব এখন এই পরিষদের ওপর। আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘মেহের’ জানিয়েছে, হামলার আগে ভবনগুলো খালি করা হয়েছিল, ফলে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে ধ্বংসস্তূপ ও বিস্ফোরণের তীব্রতা শহরের সাধারণ জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানে সামরিক হুমকি ও আক্রমণের তথ্য প্রকাশ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে বলেন, শনিবার থেকে তারা ইরানে দুই হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। তিনি আরও দাবি করেন, ইরানের সবকিছু ধ্বংস করা হয়েছে, নৌবাহিনী নেই, বিমান বাহিনী নেই এবং আকাশ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা নেই। ট্রাম্পের কথায়, ইরানে ভবিষ্যতে কারা নেতৃত্ব দিতে পারে, সে বিষয়েও সম্ভাব্য প্রার্থীরা মারা গিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, “আমরা ইরানের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করছিলাম। তবে ধারণা হয়েছে, তারা আমাদের ওপর হামলা চালাতে যাচ্ছিল, যা রোধ করতে আমরা এই পদক্ষেপ নিয়েছি। আমার কারণে হয়তো ইসরায়েলকে হামলা চালাতে বাধ্য হতে হয়েছে।” তিনি একই সময়ে যুক্তরাজ্য ও স্পেনের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন, কারণ ভারত মহাসাগরে দিয়োগো গার্সিয়ায় সামরিক ঘাঁটি হামলার জন্য ব্যবহার করতে শুরুতে রাজি হয়নি যুক্তরাজ্য।
এই হামলা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করিয়েছেন, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে এ ধরনের সামরিক সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর হুমকি। তেহরানের সাধারণ মানুষ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন এবং স্থানীয় জরুরি সেবা ও সামরিক বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর। বিস্ফোরণ এবং হামলার তীব্রতায় সাধারণ নাগরিকরা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করছেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বিস্ফোরণের সময় শহরের অনেক মানুষ নিজ নিজ বাড়ি থেকে বাইরে বের হতে পারেননি। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইতিমধ্যেই সতর্কবার্তা জারি করেছে।
অন্যদিকে, স্যাটেলাইট ও ড্রোন ভিডিও বিশ্লেষণ থেকে দেখা গেছে, হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোতে ধ্বংসস্তূপ ছড়িয়ে আছে এবং আশেপাশের এলাকায় ধোঁয়া ও ধূলিকণার স্তর বিরাজ করছে। তেহরানের হাসপাতালে আশঙ্কাজনক পর্যায়ে আহতদের চিকিৎসার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, যদিও এখনও হতাহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানা যায়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান-ইসরায়েল সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছে। তেহরানের সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ এবং মানবিক উদ্বেগকে বৃদ্ধি করেছে। তারা মনে করান, সামরিক হামলার পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধান ও সংলাপের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
সংক্ষেপে বলা যায়, তেহরানের সাম্প্রতিক বিস্ফোরণ ও ইসরায়েলি বিমান হামলা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই হামলার পরবর্তী ফলাফল ও ধ্বংসস্তূপের মূল্যায়ন পরবর্তী কয়েক দিনে আন্তর্জাতিক নজরে থাকবে।