নগরকান্দায় কৃষিজমির মাটি কাটায় ব্যবসায়ীকে জরিমানা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ, ২০২৬
  • ৩ বার
নগরকান্দায় কৃষিজমির মাটি কাটায় ব্যবসায়ীকে জরিমানা

প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলায় কৃষিজমি থেকে অবৈধভাবে মাটি কেটে বিক্রি করার অভিযোগে এক ব্যবসায়ীকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়েছে। কৃষিজমি রক্ষা এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে স্থানীয় প্রশাসনের চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বুধবার বিকেলে উপজেলার লস্করদিয়া ইউনিয়নের কল্যাণপট্টি এলাকায় প্রকাশ্যে ফসলি জমি থেকে ভেকু মেশিন দিয়ে মাটি কাটার সময় অভিযান চালিয়ে মো. কামরুজ্জামান নামের এক মাটি ব্যবসায়ীকে ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকার কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃষিজমির উর্বর মাটি কেটে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে আসছিলেন। এসব মাটি সাধারণত ইটভাটা, বাড়ি নির্মাণ কিংবা রাস্তা ভরাটের কাজে ব্যবহৃত হয়। তবে এই প্রক্রিয়ায় কৃষিজমির উর্বরতা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় এবং জমি কৃষিকাজের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। স্থানীয় কৃষক ও সচেতন নাগরিকদের অভিযোগের ভিত্তিতেই প্রশাসন বিষয়টি নজরে নেয় এবং অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়।

বুধবার বিকেলে উপজেলার কল্যাণপট্টি এলাকায় প্রকাশ্যে ভেকু মেশিন দিয়ে কৃষিজমি থেকে মাটি কাটার খবর পেয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আফরোজা হক তানিয়ার নেতৃত্বে একটি ভ্রাম্যমাণ আদালতের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, একটি কৃষিজমি থেকে বড় আকারের যন্ত্র ব্যবহার করে মাটি কেটে ট্রলির মাধ্যমে অন্যত্র নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। এ সময় ঘটনাস্থলেই অভিযুক্ত মাটি ব্যবসায়ী মো. কামরুজ্জামানকে আটক করা হয়।

ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী কর্মকর্তা জানান, তদন্তে প্রাথমিকভাবে প্রমাণ পাওয়া যায় যে অভিযুক্ত ব্যক্তি অনুমতি ছাড়াই কৃষিজমি থেকে মাটি কেটে তা বিক্রি করছিলেন। এই কাজের ফলে কৃষিজমির উর্বরতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি এলাকার পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় তাকে ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, কৃষিজমির উর্বর মাটি অবৈধভাবে কেটে নেওয়া শুধু আইনগত অপরাধই নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করে। কারণ কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি সাধারণত অত্যন্ত উর্বর এবং এতে ফসল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জৈব উপাদান থাকে। এই মাটি কেটে ফেলা হলে জমির স্বাভাবিক উৎপাদন ক্ষমতা অনেকাংশে কমে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে জমি দীর্ঘ সময়ের জন্য অনাবাদি হয়ে পড়ে।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী দ্রুত লাভের আশায় কৃষকদের প্রলোভন দেখিয়ে জমির মাটি কেটে নেওয়ার প্রস্তাব দেন। অনেক সময় কৃষকরা সাময়িক আর্থিক লাভের আশায় জমির মাটি কাটতে সম্মতি দেন। কিন্তু পরে দেখা যায়, জমি আগের মতো আর উর্বর থাকে না এবং ফসল উৎপাদন কমে যায়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন।

অভিযান চলাকালে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় কৃষিজমি থেকে মাটি কাটার ঘটনা ঘটছিল। এতে শুধু কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল না, বরং এলাকার রাস্তা-ঘাটও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। ভারী ট্রলি ও ট্রাক চলাচলের কারণে গ্রামীণ সড়ক ভেঙে যাচ্ছে এবং পরিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আফরোজা হক তানিয়া বলেন, কৃষিজমির মাটি অবৈধভাবে কেটে বিক্রি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার জন্য সংশ্লিষ্টদের কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। জনস্বার্থে অবৈধভাবে মাটি ও বালি উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

তিনি আরও জানান, কৃষিজমি সংরক্ষণ এবং পরিবেশ রক্ষার জন্য প্রশাসন নিয়মিত নজরদারি করছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অনুমতি ছাড়া কৃষিজমি থেকে মাটি কাটলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণকে এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কৃষিজমির মাটি কেটে নেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হলে শুধু প্রশাসনিক অভিযানই যথেষ্ট নয়, এর পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। কারণ অনেক সময় স্থানীয় মানুষ বিষয়টির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি সম্পর্কে অবগত থাকেন না। তাই কৃষিজমির গুরুত্ব এবং এর সুরক্ষা বিষয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানোর প্রয়োজন রয়েছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে কৃষিজমি সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য উৎপাদনের চাহিদাও বাড়ছে। তাই কৃষিজমির উর্বরতা বজায় রাখা এবং জমি রক্ষা করা রাষ্ট্রীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নগরকান্দা উপজেলায় ভবিষ্যতেও এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হবে। বিশেষ করে কৃষিজমি থেকে মাটি কেটে বিক্রি করা, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন এবং পরিবেশবিধ্বংসী কার্যক্রম বন্ধে কঠোর নজরদারি রাখা হবে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা আশা করছেন, নিয়মিত অভিযান এবং কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে কৃষিজমি রক্ষা করা সম্ভব হবে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকবে।

বিশ্লেষকদের মতে, কৃষিজমি রক্ষায় প্রশাসনের কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অবৈধ ব্যবসা অনেকটাই কমে আসবে। একই সঙ্গে কৃষকদের সচেতনতা বাড়ানো গেলে কৃষিজমির মাটি কেটে বিক্রির প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত