প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আনা এবং লাখো পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদান দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন প্রবাসীরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে মোট ৩০২ কোটি ৭ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব থেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি মাসে সৌদি আরবে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে পাঠিয়েছেন প্রায় ৪৯ কোটি ১১ লাখ মার্কিন ডলার। দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার হিসেবে পরিচিত। নির্মাণ খাত, সেবা খাত, শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন পেশায় কাজ করা লাখো বাংলাদেশি শ্রমিক সেখানে কর্মরত আছেন। তাদের উপার্জনের একটি বড় অংশ নিয়মিতভাবে দেশে পাঠানো হয়, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ফেব্রুয়ারি মাসে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্য। দেশটি থেকে এসেছে ৪৪ কোটি ৩৩ লাখ ৯০ হাজার মার্কিন ডলার। যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। তাদের অনেকেই ব্যবসা, চাকরি এবং বিভিন্ন পেশায় যুক্ত। ফলে প্রতি মাসেই যুক্তরাজ্য থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে আসে।
তালিকার তৃতীয় স্থানে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটি থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশে এসেছে ৩৭ কোটি ৪৫ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটিও বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার হিসেবে পরিচিত। নির্মাণ, পরিবহন, সেবা ও ব্যবসা খাতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি সেখানে কর্মরত।
ফেব্রুয়ারি মাসে মালয়েশিয়া থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রবাসী আয় দেশে এসেছে। এই দেশ থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ৩১ কোটি ৭৭ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার। মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশিরা মূলত উৎপাদন শিল্প, কৃষি এবং বিভিন্ন সেবা খাতে কাজ করে থাকেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মালয়েশিয়ায় নতুন শ্রমবাজার খোলার ফলে দেশটি থেকে রেমিট্যান্সের পরিমাণও বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকেও ফেব্রুয়ারি মাসে উল্লেখযোগ্য রেমিট্যান্স এসেছে। দেশটি থেকে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ২৭ কোটি ৬৩ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশিরা সাধারণত ব্যবসা, প্রযুক্তি, শিক্ষা এবং বিভিন্ন পেশাজীবী হিসেবে কাজ করেন। ফলে তাদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি বড় উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।
এ ছাড়া ওমান থেকেও এসেছে প্রায় ১৭ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। ইতালি থেকে এসেছে ১৬ কোটি ২ লাখ ৯০ হাজার মার্কিন ডলার। ইউরোপের এই দেশটিতে বসবাসরত বাংলাদেশিরা মূলত কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং সেবা খাতে কাজ করেন। তাদের পাঠানো অর্থ দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একই সময়ে কুয়েত থেকে এসেছে ১৪ কোটি ৮১ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার, সিঙ্গাপুর থেকে এসেছে ১৪ কোটি ৫৭ লাখ ৯০ হাজার মার্কিন ডলার এবং কাতার থেকে এসেছে ১২ কোটি ৫৮ লাখ ৯০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। এই দেশগুলোতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক বিভিন্ন খাতে কর্মরত রয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারি মাসে বিভিন্ন ধরনের ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ৪২ কোটি ৬০ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ৪৫ কোটি ২৫ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স, যার পরিমাণ ২১৫ কোটি ৬৯ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার। বিদেশি ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে প্রায় ৪৮ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলার।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা কিছুটা বেড়েছে। সরকার বিভিন্ন ব্যাংকিং চ্যানেলকে সহজলভ্য করা, প্রণোদনা প্রদান এবং অবৈধ হুন্ডি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে অনেক প্রবাসী এখন আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে আগ্রহী হচ্ছেন। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এর আগে জানুয়ারি মাসে দেশে এসেছিল ৩১৭ কোটি ৯ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। যা দেশের ইতিহাসে কোনো এক মাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ প্রবাসী আয় এবং চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
এদিকে পুরো ২০২৪-২৫ অর্থবছর জুড়েই রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ওই অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা মোট ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। টাকার অঙ্কে যা প্রায় ৩ হাজার ৩২ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলারের সমান। দেশের ইতিহাসে কোনো নির্দিষ্ট অর্থবছরে এটি সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়ের রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্স শুধু দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতেই সাহায্য করে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতেও বড় ভূমিকা পালন করে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দিয়ে অনেক পরিবার শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান এবং ছোটখাটো ব্যবসা পরিচালনা করতে সক্ষম হয়। ফলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়াতে হলে দক্ষ শ্রমশক্তি বিদেশে পাঠানো, নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি করা এবং প্রবাসীদের জন্য সহজ ও নিরাপদ অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে হুন্ডি বা অবৈধ অর্থ লেনদেন বন্ধে কঠোর নজরদারি জোরদার করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈদেশিক শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, প্রবাসীদের কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহ প্রদান করা গেলে ভবিষ্যতে দেশের প্রবাসী আয় আরও বাড়বে। যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।