সরকার পতনের পর নেপালে ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ, ২০২৬
  • ৪ বার
সরকার পতনের পর নেপালে ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচন

প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দুর্নীতিবিরোধী গণআন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতনের কয়েক মাস পর নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে হিমালয় ঘেরা দেশ নেপাল। আজ ৫ মার্চ দেশটির জনগণ ভোট দিচ্ছেন নতুন সরকার নির্বাচনের জন্য। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জনবিক্ষোভের পর অনুষ্ঠিত হওয়া এই সাধারণ নির্বাচনকে নেপালের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তরুণদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া ব্যাপক দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের মুখে তৎকালীন সরকারের পতনের পর এই নির্বাচনই হচ্ছে প্রথম জাতীয় ভোট।

সরকার পতনের পর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের হাতে। সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কির নেতৃত্বে গঠিত এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শুরু থেকেই দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। সেই প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবেই ছয় মাসের মধ্যে এই সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করা হয়েছে। নির্বাচনটি শুধু নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়, বরং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পুনর্গঠনের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

নেপালের নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ নতুন ভোটার প্রথমবারের মতো ভোট দিচ্ছেন। স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে এবং বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট চলবে। তবে যেসব এলাকায় ভোটারদের উপস্থিতি বেশি কিংবা দূরবর্তী অঞ্চল থেকে ভোটাররা আসতে দেরি করেন, সেখানে ভোটকেন্দ্র নির্ধারিত সময়ের পরও খোলা রাখা হতে পারে। অতীতের কয়েকটি নির্বাচনে কিছু এলাকায় রাত পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলার নজির রয়েছে।

এই নির্বাচনে ভোটাররা সংসদের মোট ২৭৫ জন সদস্য নির্বাচন করবেন। এর মধ্যে ১৬৫ জন নির্বাচিত হবেন সরাসরি ভোটের মাধ্যমে, যাকে ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ পদ্ধতি বলা হয়। এই ব্যবস্থায় কোনো আসনে যে প্রার্থী সর্বাধিক ভোট পান, তিনি বিজয়ী হন। বাকি ১১০ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন পদ্ধতিতে। এই ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয়ভাবে যে পরিমাণ ভোট পায়, তার ভিত্তিতে সংসদের আসন বণ্টন করা হয়। দুই ধরনের নির্বাচনী পদ্ধতি থাকায় কোনো একক দলের পক্ষে সরাসরি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে নির্বাচনের পর জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এবারের নির্বাচনে প্রায় ৩ হাজার ৪০০–এর বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের মধ্যে এক হাজারেরও বেশি প্রার্থীর বয়স ৪০ বছরের নিচে। তরুণ প্রার্থীদের এই উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ নেপালের রাজনীতিতে একটি নতুন প্রজন্মের উত্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত প্রার্থী হলেন ৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ। কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র হিসেবে তিনি ইতোমধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। এবার তিনি ঝাপা-৫ আসনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলির বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই আসনটি দীর্ঘদিন ধরে অলির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তবে তরুণদের মধ্যে শাহের জনপ্রিয়তা এবং দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে তার ভূমিকার কারণে এই আসনে কঠিন লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

বালেন্দ্র শাহ রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। ২০২২ সালের সাধারণ নির্বাচনে দলটি চতুর্থ স্থান অর্জন করেছিল। তবে এবারের নির্বাচনে দলটি আরও ভালো ফল করতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। এমনকি দলটির পক্ষ থেকে শাহকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে।

নেপালের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল নেপালি কংগ্রেসও এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছে। দলটি অতীতে একাধিকবার সরকার গঠন করেছে এবং ২০২২ সালের সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনেও তারা জয়ী হয়েছিল। বর্তমানে দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন গগন থাপা, যিনি চারবারের সংসদ সদস্য এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জনপ্রিয় একজন রাজনীতিবিদ।

অন্যদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলির নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউএমএল) এখনও দেশের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে রয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচনে দলটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন লাভ করেছিল। এছাড়া সাবেক মাওবাদী নেতা প্রচণ্ডর নেতৃত্বাধীন নেপালি কমিউনিস্ট পার্টিও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।

রাজধানী কাঠমান্ডু উপত্যকার ১৫টি আসনের ফলাফলের দিকেও বিশেষ নজর থাকবে। কারণ শহরাঞ্চলের ভোটারদের মনোভাব অনেক সময় দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। এই অঞ্চলে তরুণ ভোটারদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় তাদের সিদ্ধান্ত নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রেও এবার দ্রুততার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভোট গণনা শুরু হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সরাসরি নির্বাচিত ১৬৫টি আসনের ফল প্রকাশ করা হবে। তবে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির ফলাফল ঘোষণা করতে আরও দুই থেকে তিন দিন সময় লাগতে পারে।

নেপালের ভৌগোলিক বাস্তবতা এই প্রক্রিয়াকে অনেক সময় জটিল করে তোলে। দেশটির মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৮০ শতাংশই পাহাড়ি এলাকা। ফলে অনেক ভোটকেন্দ্র দুর্গম অঞ্চলে অবস্থিত। এসব স্থান থেকে ব্যালট বাক্স সংগ্রহ করে গণনা কেন্দ্রে পৌঁছানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যালট বাক্স মানুষকে হাতে করে পাহাড় থেকে নামিয়ে আনতে হয়। আবার কোথাও হেলিকপ্টার বা ছোট বিমানের সাহায্য নিতে হয়।

কিছু দূরবর্তী এলাকায় সন্ধ্যার পর বিমান বা হেলিকপ্টার চলাচল সম্ভব না হওয়ায় ব্যালট সংগ্রহের কাজ পরদিন সকালে শুরু করতে হয়। এর সঙ্গে খারাপ আবহাওয়া যুক্ত হলে পুরো প্রক্রিয়া আরও বিলম্বিত হয়ে যায়। ২০২২ সালের নির্বাচনে ফলাফল প্রকাশ করতে প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লেগেছিল।

এবারের নির্বাচনের প্রধান ইস্যুগুলোর মধ্যে রয়েছে দুর্নীতি, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং সুশাসনের প্রশ্ন। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে যে গণবিক্ষোভের মাধ্যমে সরকার পতন ঘটে, সেই আন্দোলনে অন্তত ৭৭ জন নিহত হন বলে সরকারি তথ্য বলছে। নিহতদের অনেকেই পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারানো বিক্ষোভকারী ছিলেন। বিক্ষোভকারীরা সংসদ ভবন, সুপ্রিম কোর্ট এবং কেন্দ্রীয় সচিবালয়সহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগও করেছিলেন।

এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। তবে দ্রুতই তা দুর্নীতি, সামাজিক বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে বৃহত্তর গণআন্দোলনে রূপ নেয়।

রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। নেপালি কংগ্রেস সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের উচ্চপর্যায়ের তদন্তের প্রস্তাব দিয়েছে, যা ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

নেপালের এই নির্বাচন আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশী ভারত দীর্ঘদিন ধরেই নেপালের রাজনীতিতে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে আসছে এবং তারা এই নির্বাচনের দিকে গভীর নজর রাখছে। অন্যদিকে চীনও নেপালের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী, বিশেষ করে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পের কারণে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রও এই নির্বাচনের ফলাফলকে কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করছে।

সব মিলিয়ে আজকের নির্বাচন নেপালের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘ অস্থিরতার পর দেশটি কি নতুন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে এগোতে পারবে, সেই উত্তরই খুঁজছে নেপালের জনগণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত