প্রকাশ: ৫ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে। ইরানের বিভিন্ন শহর ও প্রদেশে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অন্তত ৩৩টি বেসামরিক স্থাপনায় হামলার অভিযোগ করেছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে জানিয়েছেন, হামলায় হাসপাতাল, স্কুল, আবাসিক এলাকা এবং বাজার লক্ষ্য করা হয়েছে। এই হামলায় বহু সাধারণ মানুষ নিহত এবং আহত হয়েছেন।
তেহরানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে হামলার লক্ষ্য ছিল নিলুফার চত্বরের আবাসিক এলাকা, তেহরান এবং আহভাজের হাসপাতাল, তেহরান গ্র্যান্ড বাজার, রাজধানীর দক্ষিণে অবস্থিত ঐতিহাসিক গুলিস্তান প্যালেস কমপ্লেক্স এবং হরমুজগান প্রদেশের মিনাবের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এছাড়া উত্তর-পশ্চিম ইরানের মারাগেহ অঞ্চলের আবাসিক এলাকা এবং ফার্স প্রদেশের লামের্ডের একটি খেলাধুলার হলঘরও হামলার শিকার হয়েছে। বাঘাই দাবি করেছেন, এসব ঘটনায় অনেক বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন।
পরমাণু ইস্যু সংক্রান্ত পরোক্ষ আলোচনার মধ্যেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। দিনকে দিন সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করছে। যুদ্ধের পঞ্চম দিনেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল লেবাননসহ ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা জোরদার করেছে। ইরানে নিহতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
ইরানও পাল্টা পদক্ষেপে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্র দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এই হামলার মধ্যে বিশেষভাবে লক্ষ্যযোগ্য ছিল কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটিতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং দুবাইয়ে মার্কিন কনস্যুলেটে ড্রোন বিস্ফোরণ। এই হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে।
এ মুহূর্তে ইরান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত ১২টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ইরানের হামলা, হরমুজ প্রণালীতে রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের নিয়ন্ত্রণ এবং অঞ্চলজুড়ে অস্থিরতা নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। যুদ্ধ এখন কেবল আকাশ বা স্থলে সীমাবদ্ধ নয়; নৌপথেও তীব্রতার সঙ্গে চলমান। লেবাননের আরও গভীরে ইসরাইলি সেনা প্রবেশ করেছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলঙ্কার উপকূলে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজে মার্কিন সাবমেরিন হামলা চালিয়েছে। এতে অন্তত ৮৭ জন নিহত হয়েছেন এবং বহু মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
ইরানের সামরিক প্রতিক্রিয়া, বিশেষ করে বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণে বাধ্য করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ অভিযানে অংশ নিয়েছে ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা, দুটি বিমানবাহী রণতরি ও বোমারু বিমান। তাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও পাল্টা প্রতিক্রিয়ার মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
মানবিক দিক থেকেও পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর। হাসপাতাল ও স্কুলসহ আবাসিক এলাকা লক্ষ্য হওয়ায় সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত এবং খাদ্য ও চিকিৎসা সামগ্রী সরবরাহ চ্যালেঞ্জের মধ্যে। তেহরান ও অন্যান্য শহরে আহতদের চিকিৎসার জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্যের আহ্বান জানানো হয়েছে। এছাড়া বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে স্থানীয় প্রশাসন সীমিত সক্ষমতায় চেষ্টা চালাচ্ছে।
সামরিক সংঘাত ছাড়িয়ে এই যুদ্ধ এখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যে বিশাল প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম চরমভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং গ্যাস সরবরাহেও ব্যাঘাত দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে মানবিক বিপর্যয় এবং শরণার্থী সংকট তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের মধ্যে এই উত্তেজনা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি সৃষ্টি করছে। সামরিক প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি কূটনৈতিক চেষ্টার মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত করার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। তবে যুদ্ধের বর্তমান প্রবণতা দেখে বোঝা যাচ্ছে, কূটনৈতিক সমাধান পাওয়া সহজ হবে না।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের এই সংঘাত এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রতিটি হামলা ও পাল্টা হামলা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করছে না, বরং বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক প্রভাবও ফেলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।