সর্বশেষ :
কেনিয়ায় ভয়াবহ বৃষ্টি-বন্যা, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪২ যশোরে যান্ত্রিক ত্রুটি, প্রশিক্ষণ বিমানের জরুরি অবতরণ লেবাননে হামলায় সাদা ফসফরাস ব্যবহারের প্রমাণ: এইচআরডব্লিউ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যানের সৌজন্য সাক্ষাৎ নিরাপত্তা ও সামরিক দক্ষতায় মোজতবা খামেনি ইরানের নতুন নেতা সৌদিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় টাঙ্গাইলের মোশাররফ নিহত ঈদে নতুন নোট নেই, খোলা বাজারে দাম দাড়িয়েছে আকাশছোঁয়া মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বিদ্যুৎ-জ্বালানি বাজারে প্রভাব ছড়াচ্ছে হাদি হত্যার আসল খুনি নিয়ে প্রকাশ্যে সালাহউদ্দিন আম্মার মত আজ থেকে বন্ধ দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্যোগে

হঠাৎ পরিদর্শনে মানসিক হাসপাতালের অব্যবস্থাপনায় ক্ষোভ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৮ মার্চ, ২০২৬
  • ৪০ বার
মানসিক হাসপাতালের অব্যবস্থাপনায় ক্ষোভ

প্রকাশ: ০৮ মার্চ  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল–এ হঠাৎ পরিদর্শনে গিয়ে বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম এ মুহিত। রোববার সকালে কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই তারা হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে রোগীসেবা, পরিবেশ, চিকিৎসক উপস্থিতি এবং খাবারের মানসহ নানা বিষয় সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন। পরিদর্শনের সময় হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখেন তারা এবং রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন। সেখানেই উঠে আসে চিকিৎসাসেবা ঘিরে একাধিক অভিযোগ, যা শুনে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

রোববার সকাল প্রায় ৯টার দিকে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী হাসপাতালটিতে প্রবেশ করেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ, ওয়ার্ড এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন তারা। এ সময় তাদের সঙ্গে ছিলেন হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তবে পরিদর্শনের শুরু থেকেই বেশ কিছু অসঙ্গতি চোখে পড়ে। ওয়ার্ডের বিছানাপত্রে ছারপোকার উপস্থিতি, খাবারের নিম্নমান এবং নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি—এসব বিষয় নিয়ে রোগীর স্বজনরা সরাসরি অভিযোগ করেন মন্ত্রীর কাছে।

হাসপাতালের কয়েকজন রোগীর স্বজন বলেন, মানসিক রোগীদের চিকিৎসার পাশাপাশি তাদের জন্য নিরাপদ ও মানবিক পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে এখানে সেই পরিবেশ অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। তারা অভিযোগ করেন, অনেক সময় চিকিৎসকদের দেখা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে এবং রোগীদের প্রয়োজনীয় সেবা পেতে দেরি হয়। খাবারের মান নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন স্বজনরা। তাদের দাবি, হাসপাতালে যে খাবার সরবরাহ করা হয় তা অনেক সময় মানসম্মত নয় এবং রোগীদের জন্য উপযোগীও নয়।

পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, হাসপাতালের কতজন চিকিৎসক অনুপস্থিত রয়েছেন তা সরেজমিনে এসেও স্পষ্টভাবে জানতে পারেননি। একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এমন অব্যবস্থাপনা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনের অদক্ষতা এবং পর্যাপ্ত তদারকির অভাবই এই পরিস্থিতির জন্য বড় কারণ হতে পারে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, হাসপাতালের বিছানাপত্রের অবস্থা সন্তোষজনক নয়। অনেক জায়গায় ছারপোকার সমস্যা দেখা গেছে, যা রোগীদের জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর ও অস্বাস্থ্যকর। একই সঙ্গে তিনি খাবারের মান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার ভাষায়, একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদের জন্য পুষ্টিকর এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে সেখানে নানা অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, যা দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন।

চিকিৎসকদের সময়মতো উপস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। মন্ত্রীর মতে, রোগীদের সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হলে চিকিৎসকদের উপস্থিতি ও দায়িত্বশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ হাসপাতাল পরিদর্শনের সময় এমন কিছু তথ্য পাওয়া গেছে, যা সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম এ মুহিতও হাসপাতালের পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দেশের সর্বোচ্চ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও এখানে নেতৃত্বের সংকট স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। তার মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন অনেকাংশে নির্ভর করে শক্তিশালী নেতৃত্ব এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ওপর। কিন্তু এখানে সেই নেতৃত্বের ঘাটতি রয়েছে বলেই নানা অব্যবস্থাপনা তৈরি হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে সরকার এ খাতে উন্নয়ন ঘটাতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে যদি সঠিকভাবে সেবা নিশ্চিত না হয়, তাহলে সেই উদ্যোগের সুফল পাওয়া সম্ভব হবে না। তিনি দ্রুত সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান।

এদিকে হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুর রহমান পরিদর্শনের সময় উত্থাপিত বেশিরভাগ অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে এবং সেগুলো সমাধানের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হবে। হাসপাতালের পরিবেশ উন্নয়ন এবং সেবার মান বাড়াতে প্রশাসন কাজ করছে বলেও দাবি করেন তিনি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা একটি সংবেদনশীল ক্ষেত্র। এখানে রোগীদের চিকিৎসার পাশাপাশি তাদের মানসিক স্বস্তি এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানসিক রোগীরা অনেক সময় দীর্ঘ সময় হাসপাতালে অবস্থান করেন। তাই হাসপাতালের পরিবেশ যদি অস্বাস্থ্যকর বা অব্যবস্থাপনায় ভরা থাকে, তাহলে তা রোগীর সুস্থতার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য খাত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বারবার বলেছে, মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ জনবল বৃদ্ধি এবং সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। দেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে, কিন্তু সেই তুলনায় বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধা এখনও সীমিত।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল দেশের প্রধান মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। এখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন। ফলে হাসপাতালটির সেবার মান এবং ব্যবস্থাপনা পুরো মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপরই প্রভাব ফেলে।

পরিদর্শনের সময় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী রোগীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের অভিজ্ঞতাও জানতে চান। কয়েকজন রোগীর স্বজন বলেন, চিকিৎসক ও নার্সরা অনেক সময় আন্তরিকভাবে কাজ করলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক সমস্যার কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যায় না। বিশেষ করে ওয়ার্ডের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং খাবারের মান নিয়ে তারা দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ জানিয়ে আসছেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, কয়েক দিনের মধ্যে আবারও হাসপাতালটি পরিদর্শনে যাবেন তিনি। তখন যদি একই ধরনের অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনা পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, রোগীদের সঙ্গে কোনো ধরনের অবহেলা বা অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না।

মন্ত্রী আরও বলেন, সরকার দেশের স্বাস্থ্য খাত উন্নয়নে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে যদি সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে জনগণ তার সুফল পাবে না। তাই হাসপাতালগুলোর সেবা নিশ্চিত করতে কঠোর তদারকি প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য খাতের বিশ্লেষকদের মতে, আকস্মিক পরিদর্শনের মাধ্যমে হাসপাতালের প্রকৃত চিত্র অনেক সময় সামনে আসে। কারণ পূর্ব ঘোষণা থাকলে অনেক সময় সাময়িক প্রস্তুতির মাধ্যমে প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল করা সম্ভব হয়। ফলে এই ধরনের হঠাৎ পরিদর্শন স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

সব মিলিয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর এই আকস্মিক পরিদর্শন নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালের পরিবেশ এবং সেবার মান উন্নয়নে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এখন সবার নজর রয়েছে, সরকারের নির্দেশনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত