মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বিদ্যুৎ-জ্বালানি বাজারে প্রভাব ছড়াচ্ছে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬
  • ৫১ বার
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বিদ্যুৎ-জ্বালানি বাজারে প্রভাব ছড়াচ্ছে

প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাত এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে এক নতুন অস্থিরতার ঢেউ দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে পৌঁছেছে প্রতি ব্যারেল ১০৮ দশমিক ৭৭ ডলারে, যা ২০২০ সালের করোনা মহামারির পর একদিনে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি হিসেবে রেকর্ড করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গত সপ্তাহেই তেলের দাম প্রায় ২৮ শতাংশ বেড়েছিল। বিশ্ববাজারে এই উল্লম্ফনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক হামলার সরাসরি প্রভাব আছে। তারা যৌথভাবে ইরানে হামলা চালিয়েছে এবং ইরান পাল্টা প্রতিহত করছে, ফলে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরানের একাধিক তেল ডিপোসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই ধাক্কার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশসহ তেল আমদানিনির্ভর দেশের অর্থনীতিতে। বাংলাদেশে তেল আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলে সরকারের ভর্তুকির চাপ দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, যদি মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল এবং এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) এর দাম আরও বাড়তে পারে। এতে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চাপ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ সরবরাহে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে। বিদ্যুৎ বিভাগের একটি সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (বিপিডিবি) কাছে দেশি-বিদেশি কম্পানির পাওনা ৪৬ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা আর্থিক সংকটকে আরও গভীর করছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর শর্ত অনুসারে ভর্তুকি কমানোর চাপ সরকারের জন্য নীতিগত ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালী প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেলের জন্য ব্যবহৃত হয়। এই প্রণালী যদি বন্ধ থাকে, তবে বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য উল্লম্ফিত হতে পারে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক, কারণ দেশে বছরে ৬ থেকে ৭ মিলিয়ন টন তেল আমদানি হয়, যার একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। তেলের প্রতি ব্যারেল মূল্য মাত্র ১০ ডলার বাড়লেও আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। যদি দাম ১৫০ ডলারে পৌঁছে, তবে এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং বিপিসির জন্য লোকসানের আশঙ্কা তৈরি করতে পারে।

বিদ্যুৎ খাতও সংকটের মধ্যে রয়েছে। দেশের অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র ফার্নেস অয়েলনির্ভর। তেলের দাম বেড়ে গেলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, ফলে সরকারকে অথবা ভর্তুকি বাড়াতে হবে, অথবা বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করতে হবে। এটি একটি জটিল পরিস্থিতি, কারণ আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী ভর্তুকি কমানো এবং বাজারভিত্তিক দাম নির্ধারণ অপরিহার্য।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে তেলের দাম বাড়াচ্ছে। ভিয়েতনামে ডিজেল ও পেট্রোলের দাম ইতিমধ্যে ২১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, পাকিস্তানে পেট্রোল লিটারপ্রতি ২০ শতাংশ বেড়ে ৩২০ রুপিতে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রে এক সপ্তাহে পেট্রোলের দাম ১০ শতাংশ বেড়েছে। এশিয়ার বড় তেল আমদানিকারক দেশগুলো বিকল্প উৎস খুঁজছে এবং মজুত বাড়াচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি আরও কঠিন। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে তিনটি বড় চাপ তৈরি হবে—জ্বালানি আমদানি বিল বৃদ্ধি, ভর্তুকির চাপ এবং মূল্যস্ফীতি। সরকারকে এ চাপের মধ্যে দিয়ে খাত পরিচালনা করতে হবে। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসির লাভ প্রায় ৪,২০০ কোটি টাকা, যা ২০২৩-২৪ সালে ছিল ৩,৯০০ কোটি টাকা। গত এক দশকে রাষ্ট্রায়ত্ত কম্পানির মোট লাভ ৪৮ হাজার কোটি টাকা, কিন্তু লাভের এই ইতিহাস সব সময় স্থিতিশীল নয়।

অতীতে, আন্তর্জাতিক তেলের দামের বড় ওঠাপড়া বাংলাদেশে কয়েকবার অর্থনৈতিক চাপে ফেলেছে। ২০০৮ সালে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১৪৭ ডলারে পৌঁছালে বিপিসিকে বড় ভর্তুকি দিয়ে তেল বিক্রি করতে হয়। ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে দাম ১০০ ডলারের ওপরে থাকার কারণে সরকার কয়েক দফা দাম বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক তেলের মূল্য বেড়ে গেলে দেশের তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, দেশের তেলের মজুদ ও সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অতিরিক্ত চাহিদার জন্য সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে। এই অনিশ্চয়তা বিবেচনায় সরকার তেল ব্যবহারে রেশনিং ব্যবস্থা চালু রেখেছে। যদি আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ে কিন্তু দেশে দাম সমন্বয় না করা হয়, বিপিসিকে লোকসানে তেল বিক্রি করতে হবে। এতে ঘাটতি বেড়ে যাবে এবং সরকারকে ভর্তুকি বাড়াতে হবে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি চলাকালীন জ্বালানি তেলের রেশনিং ব্যবস্থা চলবে। আপাতত বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পরিকল্পনা করা হয়নি। বিপিসির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান জানিয়েছেন, চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে তেল সরবরাহ নিশ্চিত রয়েছে, যা সরাসরি ইরান সংকটের প্রভাব থেকে বাঁচাবে।

বিদ্যুৎ খাতের জন্য এই সংকটের প্রভাব আরও তীব্র। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি ছিল ৬২ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২৫-২৬ এর সংশোধিত বাজেটে কমিয়ে ৩৬ হাজার কোটি করা হয়েছে। এলএনজি খাতে ৯ হাজার কোটি থেকে কমিয়ে ৬ হাজার কোটি রাখা হয়েছে, কিন্তু চলতি বছরের জন্য আরও বাড়ার সম্ভাবনা আছে। বিপিডিবির কাছে ৪৬ হাজার কোটি টাকার পাওনা, যার মধ্যে বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১৪ হাজার কোটি। সরকারি ও যৌথ মালিকানার কম্পানির পুঞ্জীভূত লোকসান ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই অবস্থা খাতকে শুধু আর্থিক সংকটে নয়, নীতিগত চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ফেলে দিয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। দৈনিক প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি কমে গেলে শিল্প ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে সরকার সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনা, বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ এবং চাহিদা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ জরুরি, তবে তা স্বল্পমেয়াদে সমাধান নয়।’

ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এলএনজি সরবরাহ বিপর্যস্ত হতে পারে। দুই সপ্তাহের মধ্যে সংঘাত শেষ না হলে দেশের সব ধরনের জ্বালানি সরবরাহে বড় সংকট হতে পারে। পাশাপাশি ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে।’

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, আন্তর্জাতিক বাস্তবতা বিবেচনা না করলে বিপিসির আর্থিক অবস্থা দেশের পুরো অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম ১৫০ ডলার ছাড়াতে পারে, যা আমদানি বিল, ভর্তুকি এবং বাজেট ঘাটতি বাড়াবে। মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে, পরিবহন খরচ বেড়ে কৃষি ও শিল্প উৎপাদন প্রভাবিত হবে। আইএমএফের শর্ত লঙ্ঘন হলে ঋণ কর্মসূচিও বিপন্ন হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, স্বল্পমেয়াদে বিকল্প সমাধান কঠিন। তেল মজুত বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস এবং সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনা ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের জন্য সময় এসেছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিমালা, খাতের সমন্বয় এবং সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনা শক্ত করার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com