ডেঙ্গু মোকাবিলায় মাঠে প্রধানমন্ত্রী, পরিদর্শনে হাসপাতাল-কলেজ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪ বার
ডেঙ্গু মোকাবিলায় মাঠে প্রধানমন্ত্রী, পরিদর্শনে হাসপাতাল-কলেজ

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি এবং হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সরেজমিনে দেখতে বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শন করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে তিনি ঢাকার উত্তরার কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল ও রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ পরিদর্শন করেন। এ সময় ডেঙ্গু প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কী ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে, পরিচ্ছন্নতা পরিস্থিতি কেমন এবং মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে খোঁজখবর নেন তিনি। পাশাপাশি ডেঙ্গু মোকাবিলায় সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি যখন জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হয়ে উঠেছে, তখন সরকারপ্রধানের এই পরিদর্শন হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের ওপর নতুন করে গুরুত্ব তৈরি করেছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু মশা নিধনের কর্মসূচি পরিচালনা করলেই যথেষ্ট নয়; বরং মশার বংশবিস্তারের উপযোগী পরিবেশ দূর করা, আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। এ কারণে হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো জনসমাগমপূর্ণ স্থানে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা।

প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেসসচিব হাসান শিপলু জানিয়েছেন, শনিবার সকাল ৯টা ১০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হন। তাঁর কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ডেঙ্গু পরিস্থিতি এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম দেখার কথা ছিল। এর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শনের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়। তবে কোন কোন প্রতিষ্ঠানে শেষ পর্যন্ত পরিদর্শন সম্পন্ন হয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্যের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত বিবরণ নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

উত্তরার কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রী ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চান। ডেঙ্গুর মতো মশাবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়লে হাসপাতালের ওপর রোগীর চাপ দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। সে পরিস্থিতিতে রোগী শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ, পর্যাপ্ত শয্যা এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে হাসপাতালের ভেতর ও আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল নিয়মিত পরীক্ষা করাও প্রতিরোধব্যবস্থার অংশ।

হাসপাতালগুলোতে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার বিষয়টি কেবল রোগীদের স্বস্তির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিরাপদ চিকিৎসা পরিবেশ নিশ্চিত করার সঙ্গেও জড়িত। হাসপাতালের ছাদ, বারান্দা, ড্রেন, পানির পাত্র, পরিত্যক্ত সরঞ্জাম কিংবা আশপাশের কোনো স্থানে পানি জমে থাকলে তা মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। তাই নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের মাধ্যমে এসব স্থান পর্যবেক্ষণ করা দরকার। কোনো ত্রুটি পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিও কার্যকর ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ দিক।

প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীর উপস্থিতি থাকে। ফলে এসব স্থানে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ করা শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শ্রেণিকক্ষের আশপাশ, খেলার মাঠ, ছাদ, বাগান, নালা, পানির ট্যাংক এবং পরিত্যক্ত পাত্র নিয়মিত পরীক্ষা না করলে অজান্তেই মশার বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডেঙ্গু প্রতিরোধের অভ্যাস গড়ে তুলতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে শুধু আনুষ্ঠানিক অভিযান হিসেবে না দেখে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করা প্রয়োজন। শিক্ষক ও প্রশাসনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরাও নিজেদের শ্রেণিকক্ষ এবং আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার কাজে অংশ নিতে পারে। তবে এ ধরনের কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দায়িত্বশীল তদারকি বজায় রাখা এবং স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করাও জরুরি। পরিচ্ছন্ন পরিবেশের সঙ্গে ব্যক্তিগত সুরক্ষার অভ্যাস যুক্ত হলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমানোর প্রচেষ্টা আরও কার্যকর হতে পারে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারের চলমান উদ্যোগের অংশ হিসেবে গত ১২ সেপ্টেম্বর তিন মাসব্যাপী বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি শুরু হয়। এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ডেঙ্গুর বিস্তার কমাতে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং বাড়িঘর, কর্মস্থল ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা। এর আগে সরকার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেয়। নিয়মিত মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের মাধ্যমে এ উদ্যোগ কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পরিচ্ছন্নতা অভিযান তখনই কার্যকর ফল দিতে পারে, যখন তা ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত হয়। এক দিন পরিষ্কার করার পর আবার পানি জমে থাকলে বা পরিত্যক্ত পাত্র পড়ে থাকলে মশার বংশবিস্তারের ঝুঁকি থেকেই যায়। এ কারণে বাড়ির ছাদ, ফুলের টবের নিচের পাত্র, ফেলে রাখা টায়ার, ডাবের খোসা, পানির ড্রাম এবং অন্যান্য পাত্রে পানি জমতে না দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে নালা ও পানি নিষ্কাশনের পথ সচল রাখা এবং পরিত্যক্ত বস্তু যথাযথভাবে অপসারণ করা দরকার। ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি থাকলে এসব কার্যক্রম আরও ফলপ্রসূ হতে পারে।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসার ক্ষেত্রেও সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা, বমি বমি ভাব কিংবা অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব বা শ্বাসকষ্টের মতো বিপৎসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। জ্বর কমে গেলেই রোগীর ঝুঁকি সম্পূর্ণ শেষ হয়েছে—এমন ধারণা করা ঠিক নয়। চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাওয়া জরুরি।

ডেঙ্গু প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু স্বাস্থ্য বিভাগ বা সিটি করপোরেশনের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। বাসাবাড়ি, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং নির্মাণাধীন ভবনসহ বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি অপসারণে সংশ্লিষ্ট সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা, মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ। অন্যদিকে নাগরিকদের দায়িত্ব হলো নিজ নিজ পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং আশপাশে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো।

প্রধানমন্ত্রীর হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের গুরুত্ব আবারও সামনে এসেছে। তবে পরিদর্শনের প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে চিহ্নিত সমস্যাগুলোর সমাধান, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত তদারকি এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ধারাবাহিক বাস্তবায়নের ওপর। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা ও প্রস্তুতি শক্তিশালী করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং নাগরিকদের সচেতনতা বাড়ানোর সমন্বিত উদ্যোগই ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি প্রতিটি পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় অংশগ্রহণ এখন বিশেষ প্রয়োজন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com