জামায়াতের সঙ্গে আদর্শিক দূরত্ব হারানোর অভিযোগে এনসিপি ছাড়লেন নেতা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪ বার
জামায়াতের সঙ্গে আদর্শিক দূরত্ব হারানোর অভিযোগে এনসিপি ছাড়লেন নেতা

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে দলের অভ্যন্তরে মতপার্থক্যের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠনের পর দুই দলের রাজনৈতিক অবস্থান ও বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য ক্রমে কমে আসছে—এমন অভিযোগ তুলে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির কেন্দ্রীয় সংগঠক মো. আবদুর রহমান। তাঁর দাবি, শুরুতে রাজনৈতিক জোটকে সাময়িক সমঝোতা হিসেবে দেখলেও সময়ের সঙ্গে দলের ভেতরে জামায়াতের আদর্শিক প্রভাব বেড়েছে বলে তাঁর মনে হয়েছে। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক বিষয়ে নিজের মতামতের কারণে সহকর্মীদের কাছ থেকে ‘মুজিববাদী’ বা ‘আওয়ামী লীগ’ তকমা পাওয়ার অভিযোগও তুলেছেন তিনি।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বরাবর লেখা পদত্যাগপত্র নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করেন আবদুর রহমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষার্থী দলটির দক্ষিণাঞ্চলের কেন্দ্রীয় সংগঠকের দায়িত্বে ছিলেন। পদত্যাগপত্রে তিনি জানান, এনসিপির ঘোষিত লক্ষ্য, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় এবং বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতি অঙ্গীকার তাঁকে দলটির সঙ্গে যুক্ত হতে উৎসাহিত করেছিল। কিন্তু নির্বাচনের আগে ও পরে দলের রাজনৈতিক অবস্থান এবং জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কের বিকাশ তাঁর কাছে আদর্শিক প্রশ্ন তৈরি করেছে।

আবদুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি আশা করেছিলেন রাজনৈতিক প্রয়োজনে কোনো দলের সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠিত হলেও তা আদর্শিক একীভূত হওয়ার পর্যায়ে যাবে না। সেই প্রত্যাশা থেকেই জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোটের পরও তিনি সংগঠনে থেকে কাজ চালিয়ে যান। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, সময়ের সঙ্গে দলের ভেতরে ও বাইরে রাজনৈতিক বক্তব্যের এমন পরিবর্তন দেখা গেছে, যা এনসিপির প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্য ও বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে তিনি মনে করছেন।

পদত্যাগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী ও রাজনৈতিক জোটের প্রভাবে কেন্দ্র থেকে ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত দলীয় অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে বলে তাঁর ধারণা। তাঁর অভিযোগ, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নিয়ে এনসিপির নেতা-কর্মীদের বক্তব্যও বর্তমানে জামায়াত-শিবিরের অবস্থানের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। ফলে আদর্শিক প্রশ্নে এনসিপির নিজস্ব স্বতন্ত্র অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন তিনি। এ পরিস্থিতিতে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করা তাঁর পক্ষে নৈতিক ও আদর্শিকভাবে কঠিন হয়ে উঠেছে বলে পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেন আবদুর রহমান।

তবে এগুলো আবদুর রহমানের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মূল্যায়ন ও অভিযোগ। এনসিপির পক্ষ থেকে তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করা হয়েছে। দলটির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা তাঁর পদত্যাগের পেছনে ভিন্ন কারণ তুলে ধরেছেন। ফলে এই পদত্যাগকে ঘিরে একদিকে দলের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে পদত্যাগকারী নেতার সক্রিয়তা ও সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য সামনে এসেছে।

আবদুর রহমানের অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে মতপ্রকাশের কারণে সহকর্মীদের কাছ থেকে নেতিবাচক রাজনৈতিক তকমা পাওয়ার অভিজ্ঞতা। তাঁর দাবি, ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার পর এনসিপির কয়েকজন নেতা তাঁকে ‘আওয়ামী লীগ’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর মতে, এমন আচরণ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের পরিবেশকে সংকুচিত করে।

এ প্রসঙ্গে আবদুর রহমান বলেন, আন্দোলনের সময় তাঁদের স্লোগান ছিল, “বঙ্গবন্ধুর বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই”। তাঁর বক্তব্য, ইতিহাসের কোনো ব্যক্তিত্ব বা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘটনাকে ঘিরে মতামত প্রকাশ করলেই কাউকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ে চিহ্নিত করা উচিত নয়। সহকর্মীদের কাছ থেকে এমন তকমা পাওয়ায় তিনি দুঃখ পেয়েছেন বলেও জানান। তাঁর ভাষ্য, এসব অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও দলের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।

আবদুর রহমানের রাজনৈতিক পথচলায় একাধিক পর্যায় রয়েছে। তিনি একসময় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০১৯ সালে ছাত্রলীগ-সমর্থিত প্যানেল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ২০২২ সালে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কমিটি সম্প্রসারিত হলে তাঁকে সদস্য করা হয়। তবে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভ্যুত্থানের পর তিনি এনসিপির সঙ্গে যুক্ত হন এবং দলটির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এনসিপির প্রাথমিক প্রার্থী তালিকাতেও আবদুর রহমানের নাম ছিল। শরীয়তপুর-১ আসনে তাঁকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে রাখা হয়েছিল। পরে এনসিপি ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের শরিক হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তিনি আর দলীয় মনোনয়ন পাননি। এ ঘটনাও তাঁর রাজনৈতিক যাত্রার প্রেক্ষাপটের অংশ। তবে মনোনয়ন না পাওয়া এবং বর্তমান পদত্যাগের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিয়ে তাঁর বক্তব্য ও দলের বক্তব্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে।

দল ছাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আবদুর রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোট গঠনের সময় সেটিকে সাময়িক রাজনৈতিক সমঝোতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। তাঁর মতে, নির্বাচনী প্রয়োজনে জোট গঠন রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হতে পারে, কিন্তু জোটের কারণে দুই দলের বক্তব্য ও আদর্শিক অবস্থান একাকার হয়ে গেলে তা আলাদা বিষয়। তিনি মনে করছেন, বর্তমানে জামায়াত ও এনসিপির রাজনৈতিক বয়ানের মধ্যে আগের মতো পার্থক্য দেখা যাচ্ছে না। এই পরিবর্তনই তাঁর পদত্যাগের অন্যতম কারণ বলে জানান তিনি।

এদিকে এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের অন্যতম সদস্য সারোয়ার তুষার আবদুর রহমানের অভিযোগের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, আবদুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় ছিলেন এবং দেশের বাইরে চলে গিয়েছিলেন। সারোয়ার তুষারের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষে বক্তব্য তৈরি করতে দেখা গেছে। এ কারণে দলটির পুনর্গঠিত কমিটিতে তাঁকে রাখা হবে না—এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পরই তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন সারোয়ার তুষার।

আবদুর রহমানের জামায়াত-এনসিপি সম্পর্ক নিয়ে অভিযোগের জবাবে সারোয়ার তুষার বলেন, বিষয়টি যদি তাঁর কাছে মৌলিক আদর্শিক সংকট হয়ে থাকত, তাহলে নির্বাচনের আগে অন্য নেতাদের দল ছাড়ার সময়ই তাঁর সরে যাওয়া উচিত ছিল। নির্বাচনের প্রায় আট মাস পর পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ায় তিনি এর পেছনে সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও কমিটিতে স্থান না পাওয়ার আশঙ্কাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। সারোয়ার তুষারের ভাষায়, পুনর্গঠিত কমিটিতে রাখা হচ্ছে না বুঝতে পেরেই আবদুর রহমান পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি পদত্যাগের ঘটনাকে ‘নাটক’ বলেও আখ্যা দেন।

দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, পদত্যাগের কারণ নিয়ে তাদের ব্যাখ্যা এক নয়। আবদুর রহমান যেখানে আদর্শিক অবস্থান, জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সামনে এনেছেন, সেখানে এনসিপির সারোয়ার তুষার তাঁর নিষ্ক্রিয়তা ও পুনর্গঠিত কমিটিতে স্থান না পাওয়ার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এই মতবিরোধের নিরপেক্ষ মূল্যায়নের জন্য উভয় পক্ষের বক্তব্য, দলীয় সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপট এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনাপ্রবাহ বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এনসিপির মতো নতুন রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে দলীয় আদর্শ, জোটনীতি এবং সংগঠনের ভেতরে ভিন্নমতের জায়গা নিয়ে বিতর্ক রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, গণতান্ত্রিক চর্চা ও বহুত্ববাদের কথা বলা কোনো দলের জন্য জোট গঠনের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান কতটা স্পষ্ট রাখা হচ্ছে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একইভাবে, কোনো নেতার পদত্যাগের পেছনে আদর্শিক দ্বন্দ্ব নাকি সাংগঠনিক অসন্তোষ কাজ করেছে, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কেবল একটি পক্ষের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়।

আবদুর রহমানের পদত্যাগ এনসিপির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে তাঁর অসন্তোষকে প্রকাশ্যে এনেছে। তবে তাঁর অভিযোগের জবাবে দলটির পক্ষ থেকে যে পাল্টা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তাতে বিষয়টি কেবল আদর্শিক বিরোধে সীমাবদ্ধ থাকছে না; দলীয় সক্রিয়তা, নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক এবং কমিটি পুনর্গঠনের প্রশ্নও আলোচনায় এসেছে। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে এনসিপির আনুষ্ঠানিক অবস্থান, দলীয় কাঠামোয় পরিবর্তন এবং সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয় হয়ে থাকতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com