প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি নতুন সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে তেলের দাম ৯০ ডলার পেরিয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত হলে শুধু তেল নয়, সারসহ আরও অনেক জরুরি পণ্যের সরবরাহও দিশেহারা হতে পারে। এই সংকটের প্রতিক্রিয়া বিশ্বব্যাপী খাদ্য ও জ্বালানির বাজারে পড়তে পারে এবং বাংলাদেশও তার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে না।
বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (FAO) জানাচ্ছে, ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বজুড়ে খাদ্যের দাম বেড়েছে। গম, ভোজ্যতেল, মাংসসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে খাদ্যপণ্যের সামগ্রিক মূল্য সূচক ফেব্রুয়ারিতে ১২৫ দশমিক ৩ পয়েন্টে পৌঁছেছে, যা জানুয়ারির তুলনায় ১ দশমিক ১ পয়েন্ট বৃদ্ধি। গমের দাম বেড়েছে ১ দশমিক ১ শতাংশ, ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ এবং মাংসের দাম বেড়েছে প্রায় ৮ শতাংশ। যদিও চালের দাম খুব কম বেড়েছে এবং দুগ্ধজাত পণ্যের দাম কমেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় বিশ্ব বাজারে যে মূল্যস্ফীতির ঢেউ তৈরি হয়েছিল, তা থেকে এখনো দেশগুলো বেরোতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান মনে করেন, ইসরায়েল-ইরান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেলের মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের জন্য মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। উচ্চ দামের তেল আমদানি করতে গিয়ে দেশের বৈদেশিক রিজার্ভের ওপর চাপ পড়বে, যা দৈনন্দিন জীবন, শিল্প উৎপাদন এবং রপ্তানি কার্যক্রমে প্রভাব ফেলবে।
তেলের পাশাপাশি অন্যান্য পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের দামও বাড়ছে। জেট জ্বালানি, ইউরিয়া ও অন্যান্য শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের সরবরাহ হরমুজ প্রণালির উপর নির্ভরশীল। নৌপথে যেকোনো বিঘ্ন সরবরাহ চেইনে বিশাল প্রভাব ফেলে, যার ফলে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। কাতারের জ্বালানিমন্ত্রী সতর্ক করে বলেছেন, যদি পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারের উপরে চলে যেতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এই সংকটের প্রভাব বহুমুখী। প্রথমত, প্রবাসী আয় প্রভাবিত হবে। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রায় ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিকের আয় অনিশ্চিত হতে পারে। তেল ও খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি শ্রমিক প্রেরণাও কমে যেতে পারে, যা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। দ্বিতীয়ত, রপ্তানিকারকরা হরমুজ প্রণালির ঝুঁকি ও জাহাজ চলাচলের বিমা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা ব্যাহত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারের কৌশল হতে পারে স্বচ্ছ নীতি গ্রহণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। অর্থাৎ, মজুত তেলের পরিমাণ, রেশনিং, এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি জনগণের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা উচিত। এছাড়া বাজেট পরিকল্পনায় যুদ্ধ পরিস্থিতির ঝুঁকি বিবেচনা করা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো এবং ব্যক্তিপর্যায় কৃচ্ছ্রসাধন কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রভাব কমানোর উপায় অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, এই পরিস্থিতি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের তুলনায় আরও ভয়ঙ্কর হতে পারে। যদি ইসরায়েল-ইরান সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, বিশ্ববাজারে তেল ও খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে এবং বাংলাদেশে অর্থনৈতিক চাপ আরও বেড়ে যাবে। এই সংকট মোকাবিলায় সরকারের সময়মতো কার্যকর কৌশল নেওয়া অপরিহার্য।
এভাবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সমন্বয় রেখে তেলের বাজার, খাদ্য নিরাপত্তা, প্রবাসী আয় এবং রপ্তানি সুরক্ষিত করতে হলে বাংলাদেশকে পূর্বদৃষ্টি এবং প্রস্তুতি নিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্বচ্ছ নীতি, কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং সামাজিক নিরাপত্তার সম্প্রসারণই এ সংকট মোকাবিলার মূল চাবিকাঠি।