প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের নারী ফুটবল সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক সাফল্যের গল্প লিখছে। দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে এবার তারা নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের মঞ্চ পেয়েছে এশিয়ার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতাগুলোর একটি—এএফসি নারী এশিয়ান কাপ। প্রথমবারের মতো এই আসরে অংশ নিয়ে ইতোমধ্যে নতুন ইতিহাস রচনা করেছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। যদিও মাঠের ফলাফল এখনো কাঙ্ক্ষিত হয়নি, তবু লড়াইয়ের মনোভাব ও সাহসী পারফরম্যান্স ফুটবলপ্রেমীদের আশা জাগিয়েছে। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জয় দিয়ে এই ঐতিহাসিক অভিযানের সমাপ্তি টানতে চায় বাংলাদেশের মেয়েরা।
অস্ট্রেলিয়ার পার্থ রেক্টাঙ্গুলার স্টেডিয়ামে আজ বাংলাদেশ সময় বেলা ৩টায় মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ ও উজবেকিস্তান। এই ম্যাচটি শুধু আনুষ্ঠানিকতার নয়, বরং বাংলাদেশের জন্য বড় একটি সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। যদিও গ্রুপে টানা দুই ম্যাচ হেরে পয়েন্টশূন্য অবস্থায় রয়েছে দলটি, তবু শেষ ম্যাচে জয় পেলে হিসাব-নিকাশে এখনও শেষ আটে ওঠার সম্ভাবনা জিইয়ে থাকবে।
এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের শুরুটা ছিল কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে। প্রথম ম্যাচেই এশিয়ার শক্তিশালী দল চীনের বিপক্ষে মাঠে নামে আফঈদা খন্দকার, ঋতুপর্ণা চাকমা ও তাদের সতীর্থরা। অভিষেক ম্যাচে প্রতিপক্ষ ছিল এশিয়ার ফুটবল শক্তি হিসেবে পরিচিত একটি দল। তবে বাংলাদেশের মেয়েরা ভয় পেয়ে যায়নি। বরং সাহসী ফুটবল খেলেই ম্যাচটি লড়াই করে শেষ করেছে। যদিও শেষ পর্যন্ত ২-০ গোলে হার মানতে হয়েছে, কিন্তু তাদের দৃঢ়তা ও সংগ্রামী পারফরম্যান্স প্রশংসা কুড়িয়েছে অনেকের।
দ্বিতীয় ম্যাচে প্রতিপক্ষ ছিল উত্তর কোরিয়া, যারা নারী ফুটবলে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে পরিচিত। সেই ম্যাচে অবশ্য বাংলাদেশের জন্য লড়াইটা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ম্যাচজুড়ে উত্তর কোরিয়ার আধিপত্যের সামনে টিকতে পারেনি বাংলাদেশের মেয়েরা এবং শেষ পর্যন্ত ৫-০ গোলের বড় ব্যবধানে হারতে হয়েছে। তবু এই হারকে শিক্ষা হিসেবে নিয়ে শেষ ম্যাচে নতুন উদ্যমে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে দল।
গ্রুপ ‘বি’ তে এখন পর্যন্ত পয়েন্ট টেবিলের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দুই ম্যাচ জিতে ৬ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে রয়েছে উত্তর কোরিয়া। সমান পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে চীন। অন্যদিকে এখনো পয়েন্টের দেখা পায়নি উজবেকিস্তান ও বাংলাদেশ। তবে গোল ব্যবধানে এগিয়ে থাকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে উজবেকিস্তান এবং চতুর্থ স্থানে বাংলাদেশ।
এই পরিস্থিতিতে আজকের ম্যাচটি দুই দলের জন্যই মর্যাদার লড়াই। উভয় দলই প্রথম দুই ম্যাচে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের কাছে হেরেছে। তাই শেষ ম্যাচে জয় তুলে নিয়ে অন্তত ইতিবাচক স্মৃতি নিয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করতে চাইবে তারা।
তবে বাংলাদেশের জন্য ম্যাচটির গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ গ্রুপ পর্ব শেষে তিনটি গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ দল সরাসরি কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেবে। পাশাপাশি তিন গ্রুপে তৃতীয় হওয়া দলগুলোর মধ্যে সেরা দুটি দলও শেষ আটে ওঠার সুযোগ পাবে। সেই হিসাবেই উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জয় বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যদি বাংলাদেশ এই ম্যাচে জয় পায় এবং অন্য গ্রুপের ফলাফল অনুকূলে আসে, তবে শেষ আটে ওঠার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে পারলে সেটি হবে বাংলাদেশের নারী ফুটবলের জন্য আরেকটি ঐতিহাসিক সাফল্য। কারণ এই টুর্নামেন্টের পারফরম্যান্সের ওপরই নির্ভর করছে আগামী নারী বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা। ফলে শেষ ম্যাচে জয় পেলে শুধু একটি ম্যাচ জেতাই হবে না, বরং ভবিষ্যতের বড় স্বপ্নের পথও খুলে যেতে পারে।
অন্যদিকে উজবেকিস্তানের জন্যও ম্যাচটি সহজ নয়। মধ্য এশিয়ার এই দলটি এর আগে পাঁচবার নারী এশিয়ান কাপে অংশ নিয়েছে। তবে দীর্ঘদিন পর এবার আবার বাছাইপর্ব পেরিয়ে মূল পর্বে খেলছে তারা। অভিজ্ঞতার দিক থেকে তারা বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও এবারের টুর্নামেন্টে এখনো নিজেদের সেরাটা দেখাতে পারেনি।
ফিফা র্যাংকিংয়েও দুই দলের ব্যবধান বেশ বড়। উজবেকিস্তান বর্তমানে বিশ্বের ৪৯তম স্থানে রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ১১২তম। এই ব্যবধান অনেকের চোখে ম্যাচের পূর্বাভাস স্পষ্ট করে দিতে পারে। কিন্তু ফুটবল এমন একটি খেলা যেখানে মাঠের পারফরম্যান্সই শেষ কথা বলে।
বাংলাদেশ দলের কোচ পিটার বাটলার অবশ্য র্যাংকিংয়ের পার্থক্য নিয়ে খুব বেশি ভাবছেন না। তার মতে, মেয়েরা প্রতিটি ম্যাচ থেকেই অভিজ্ঞতা অর্জন করছে এবং নিজেদের উন্নতির জন্য লড়াই করছে। শেষ ম্যাচে দল আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাঠে নামবে এবং সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
দলের খেলোয়াড়রাও আশাবাদী। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই তারা দেখিয়েছে যে বড় প্রতিপক্ষের সামনে দাঁড়াতে ভয় পায় না। সাহসী মনোভাব এবং দলগত প্রচেষ্টাই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। শেষ ম্যাচে সেই শক্তিকেই কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশের নারী ফুটবলাররা।
বাংলাদেশে নারী ফুটবল এখন অনেকটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মেয়েদের সাফল্য দেশের ফুটবলপ্রেমীদের নতুন করে আশাবাদী করেছে। তাই আজকের ম্যাচের দিকে তাকিয়ে আছে দেশের অসংখ্য সমর্থক।
শেষ ম্যাচে যদি জয় আসে, তবে তা শুধু একটি ম্যাচ জয়ের আনন্দই দেবে না; বরং বাংলাদেশের নারী ফুটবলের ইতিহাসে নতুন এক অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে থাকবে। আর যদি ফলাফল অনুকূলে না-ও আসে, তবুও এই টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ নিজেই একটি বড় অর্জন। কারণ এশিয়ার সেরা দলগুলোর বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নারী ফুটবলকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে।
সব মিলিয়ে আজকের ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য সম্মান, আত্মবিশ্বাস এবং সম্ভাবনার লড়াই। ইতিহাসের মঞ্চে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়া মেয়েরা এবার চাইবে শেষটাও হোক রঙিন।