রোগবালাই নিরাময়ে ভেষজ ঘাসপাতা, প্রকৃতির কাছেই ফিরছে চিকিৎসা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৭ জুলাই, ২০২৫
  • ৩৪ বার

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভাবনীয় অগ্রগতির মাঝেও আজকের মানুষ আবারও ফিরে তাকাচ্ছে প্রকৃতির দিকে। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, রাসায়নিক নির্ভরতা আর দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ক্ষতির ভয় থেকে মুক্তির আশায় বহু মানুষই ঝুঁকছেন প্রাকৃতিক ও ভেষজ চিকিৎসার দিকে। আর এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় নতুন করে আলোচনায় এসেছে বহু যুগ ধরে ব্যবহার হয়ে আসা ভেষজ ঘাস, লতা-পাতা এবং গাছগাছড়া—যা আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

প্রাচীন আয়ুর্বেদ, ইউনানি, আর হারবাল চিকিৎসা পদ্ধতিতে দীর্ঘকাল ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসা অনেক ভেষজ উদ্ভিদ আধুনিক গবেষণাতেও কার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে। এসব ভেষজ উপাদান শুধু সস্তা নয়, বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন এবং দীর্ঘমেয়াদে শরীরের ভেতরকার প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এমন বহু ভেষজ উদ্ভিদ রয়েছে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রীতিমতো ঘরোয়া চিকিৎসার অংশ হয়ে উঠেছে। যেমন ধরুন তুলসী পাতা—সর্দি-কাশি, জ্বর, গলা ব্যথা থেকে শুরু করে হজমের সমস্যা পর্যন্ত অনেক কিছুতেই এটি ব্যবহৃত হয়। আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাও বলছে, তুলসী একটি শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং এতে রয়েছে প্রদাহনাশক উপাদান।

এছাড়া থানকুনি পাতা, যা গ্রামের মাচার নিচে সহজেই জন্মায়, তা পেটের সমস্যা, আমাশয় এবং রক্ত পরিশোধনে বহু আগে থেকেই ব্যবহার হয়ে আসছে। একইভাবে মিষ্টি নিম বা বাসক পাতাও কাশি ও শ্বাসকষ্ট কমাতে বিশেষভাবে কার্যকর। বর্ষাকালে যে গাছগুলো আগাছা ভেবে উপেক্ষা করা হয়—তেমন অনেক উদ্ভিদই আসলে ওষুধি গুণে ভরপুর।

কয়েকটি গবেষণাপত্র বলছে, করোলার পাতা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক, পাথরকুচি পাতা কিডনির সমস্যা কমায়, আর অশ্বগন্ধা নামের একটি ভেষজ মূল মানসিক চাপ হ্রাসে কার্যকর। এমনকি লেবু ঘাস (লেমনগ্রাস) দিয়ে তৈরি চা শুধু পেটের সমস্যা নয়, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও কাজে দেয়।

বর্তমানে বিভিন্ন হারবাল কোম্পানি এসব ভেষজ উপাদানকে ব্যবহার করে তৈরি করছে তেল, লোশন, সিরাপ কিংবা ক্যাপসুল। কিন্তু এর বাইরেও ঘরোয়া ব্যবহারে সচেতনতার মাধ্যমে নিজে নিজেও ছোটখাটো রোগবালাইয়ের প্রাথমিক চিকিৎসা করা সম্ভব।

তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা একটি বিষয় সবসময় মনে করিয়ে দেন—ভেষজ উদ্ভিদেরও মাত্রা রয়েছে। অন্ধভাবে কোনো কিছু ব্যবহার না করে অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজন বুঝে ব্যবহার করাই উত্তম। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, শিশু কিংবা কোনো দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ঘরোয়া ভেষজ চিকিৎসা নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভেষজ উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণা চলছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বাংলাদেশের মাটি ও জলবায়ু বহু ওষুধি গাছের জন্য অত্যন্ত উপযোগী, এবং এই প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে দেশীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একটি বিপ্লব ঘটানো সম্ভব।

যেখানে সারা পৃথিবী আজ পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছে, সেখানে আমাদের পূর্বপুরুষদের জানা এই ঘাস-পাতা-লতা-গুল্মের ভাণ্ডার হয়ে উঠতে পারে আগামী দিনের স্বাস্থ্য রক্ষার অন্যতম প্রধান ভরসা। প্রয়োজন শুধু সচেতনতা, গবেষণা এবং সঠিক প্রচারের। কারণ প্রকৃতিই আমাদের সবচেয়ে প্রাচীন এবং সবচেয়ে বিশ্বস্ত চিকিৎসক।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত