প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা—খাবারের নিম্নমান—রমজান মাসে আরও উস্কানি পায়। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করছেন, এই পবিত্র মাসে খাবারের দাম বেড়ে গেলেও মান যথারীতি নিম্নমানের থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং হল কর্তৃপক্ষ নীরব থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ডাকসুর প্রতিনিধিরাও ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীবান্ধব নানা উদ্যোগ গ্রহণ করলেও ক্যান্টিনের খাবারের মানোন্নয়নে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
শিক্ষার্থীদের কথায়, রমজানে খাবারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, অথচ মানের উন্নতি হয় না। স্যার এ এফ রহমান হলের এক শিক্ষার্থী জানান, ‘বেঁচে থাকার তাগিদে খেতে হয়। কিন্তু খাবার গলা দিয়ে নেমে যায় না।’ বিভিন্ন হল ঘুরে জানা গেছে, সাহরির খাবারের দাম ৭০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যেখানে একই মানের খাবার সন্ধ্যায় ৫০-৬০ টাকায় বিক্রি হয়। হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের শিক্ষার্থী সাকিব আহমেদ বলেন, ‘একই খাবার রাতের সময়ে ৫০-৬০ টাকা, আর সাহরির সময় ৮০-১০০ টাকা। শিক্ষার্থীরা যেন ক্যান্টিন মালিকদের হাতে জিম্মি।’
ক্যান্টিনের ক্যান্টিন ম্যানেজাররা বলেন, রমজানে বাজারের দাম বেড়ে যায়। কোনো ভর্তুকি না থাকায় দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই। তবে শিক্ষার্থীরা বলছেন, দাম বাড়লেও খাবারের মান বাড়েনি। ডাল অনেক সময় ‘হলুদ পানি’ মনে হয়, ভাত মোটা ও নিম্নমানের চালের, সবজি সস্তা ও নিম্নমানের। রান্না করা মাংস কখনো শক্ত, কখনো আবার অস্বাস্থ্যকর।
এক কেজি ব্রয়লার মুরগিকে ২৫ থেকে ৩০ টুকরা করা হয়। মাংস বেশি টুকরা না করলে খরচ ওঠে না। মাছের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, খাবার পরিবেশন স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন করে। তরকারিতে চুল, তেলাপোকা, পোকামাকড়, কাঠের টুকরো বা ইটের কণা পাওয়া যায়। রান্নার পরও মাছের পেটের ময়লা থাকে।
শিক্ষার্থীরা টেস্টিং সল্ট ব্যবহারকেও সমস্যা হিসেবে দেখছেন। ক্যান্টিনে প্রায় সব খাবারে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, অতিরিক্ত টেস্টিং সল্টে স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মাথাব্যথা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, শ্বাসকষ্ট এবং জটিল স্নায়ুরোগের ঝুঁকি বাড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. নাজমা শাহীন বলেন, এমএসজি অতিরিক্ত গ্রহণে শরীরের সোডিয়ামের মাত্রা বেড়ে যায়, যা কার্ডিওভাসকুলার রোগ এবং নার্ভের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। অধ্যাপক ড. এম সাইদুল আরেফিন বলেন, শিক্ষার্থীরা পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। খাবারে শর্করা থাকলেও প্রোটিনের ঘাটতি রয়ে গেছে, আর নিম্নমানের ফ্যাটি অয়েল দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ দপ্তরের কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, হল ক্যান্টিনগুলোতে কোনো ভর্তুকি নেই। প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বাজেট সীমিত হওয়ায় ভর্তুকি দেওয়ার সুযোগ নেই। উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) সায়মা হক বিদিশা বলেন, খাবারের মান বাজে হলেও বাজেটে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
ডাকসুর প্রতিনিধিরাও কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। কমন রুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক উম্মে সালমা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বিষয়গুলো জানিয়েও কোনো ফল পাওয়া যায় না। শিক্ষার্থীরা আশাহত, কারণ রমজানে খাবারের দামের সঙ্গে মানের কোনো সম্পর্ক দেখা যায় না।
এই অবস্থায় শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি ঝুঁকির পাশাপাশি মানসিক চাপও বেড়ে যাচ্ছে। প্রতিদিনের খাদ্য ব্যবস্থাপনায় এই সমস্যা রমজান মাসে আরও তীব্র হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, হল কর্তৃপক্ষ এবং ডাকসু মিলিতভাবে এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে সমাধান করতে হবে, নতুবা স্বাস্থ্য ও শিক্ষার স্বার্থে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হবে না।