প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই নতুন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার নাম ঘোষণা করেছে। স্থানীয় সময় সোমবার ভোরে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আলি খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এই ঘোষণা ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে, কারণ মোজতবার ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে বাইরের অনেকের কাছে খুব কম তথ্যই রয়েছে।
আলি খামেনির ঘনিষ্ঠ বৃত্তের বাইরে মোজতবার ব্যক্তিত্ব আজও রহস্যময়। তিনি দীর্ঘদিন ক্ষমতার আড়ালে থাকলেও সামরিক ও গোয়েন্দা কার্যক্রমে তার প্রভাব ছিল। বিশেষ করে বিপ্লবী গার্ড কর্পসের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে কেন্দ্র করে তিনি এই বাহিনীর পছন্দের প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হতেন। সোমবার নাম ঘোষণার পরপরই মোজতবাকে পূর্ণ ধর্মীয় মর্যাদা আয়াতুল্লাহ উপাধি দেওয়া হয়েছে, যা ইরানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরান ও শিয়া ইসলাম বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ভালি নাসর বলেন, “মোজতবা খামেনিকে নির্বাচন করা অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হতে পারে, তবে এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত। এটি আলি খামেনির নীতির ধারাবাহিকতাকে বজায় রাখে। পাশাপাশি তিনি দ্রুত ক্ষমতা সুসংহত করতে এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবেন।” নাসর আরও উল্লেখ করেন, “অনেক দিন ধরেই মোজতবার নাম সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে উচ্চারণ করা হচ্ছিল। তবে গত দুই বছর ধরে তিনি আলোচনার বাইরে ছিলেন।”
নতুন নেতা বাছাই প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত তিনজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রয়াত আলি খামেনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তিনি চান না তার ছেলেকে উত্তরসূরি করা হোক। কারণ, তিনি পদটিকে বংশগত করতে চাইতেন না। তবে ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ বা বিশেষজ্ঞ পরিষদ মোজতবা খামেনিকে নির্বাচন করেছে। এই পরিষদে ৮৮ জন জ্যেষ্ঠ শিয়া আলেম রয়েছেন। সাধারণত নতুন নেতা নির্বাচনের ভোট দিতে এই পরিষদের সদস্যরা ইরানের ঐতিহ্যগত কেন্দ্রে মিলিত হন। তবে ফার্স নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের হামলার কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে এই বছর তারা ভার্চুয়ালি বৈঠক করেছেন।
পরিষদের অধিকাংশ জ্যেষ্ঠ আলেম মোজতবা খামেনিকে নিয়োগ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের যুক্তি ছিল, এই সংকটময় সময়ে ইরানকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তাঁর প্রয়োজনীয় যোগ্যতা রয়েছে। কিছু আলেম আরও উল্লেখ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর আলি খামেনি নিহত হলে তার ছেলেকে নেতা হিসেবে বেছে নেওয়া উত্তরাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনেরও একটি উপায়।
তেহরানভিত্তিক বিশ্লেষক মেহদি রাহমতি বলেছেন, “এই মুহূর্তে মোজতবা খামেনি সবচেয়ে বিচক্ষণ পছন্দ। নিরাপত্তা ও সামরিক কাঠামো পরিচালনা এবং সমন্বয়ের ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা রয়েছে। আগেও এই দায়িত্ব তিনি কার্যকরভাবে পালন করেছেন।”
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার ফলে আলি খামেনি ছাড়াও মোজতবার মা মানসুরেহ, স্ত্রী জাহরা আদেল ও এক ছেলে নিহত হন। এরপর সর্বোচ্চ নেতা পদের জন্য ইরানের আইনজ্ঞ আলিরেজা আরাফি এবং সাবেক সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লাহ খোমেনির নাতি হাসান খোমেনির নাম শোনা যাচ্ছিল। তবে কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, আলি খামেনির ধারা থেকে ভিন্ন পথে মোজতবা খামেনি হয়তো সংস্কারের দিকে ঝুঁকতে পারেন। তিনি তুলনামূলক তরুণ এবং বাস্তববাদী প্রজন্মের একজন আলেম। পারিবারিক পরিচয়ের কারণে কট্টরপন্থী ও রক্ষণশীল গোষ্ঠীর প্রতিরোধও তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।
মোজতবা খামেনির নিয়োগ ইরানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার দিকেও ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে সামরিক, গোয়েন্দা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ইরানের অভ্যন্তরীণ নীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। অনান্য বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মোজতবা খামেনি সম্ভবত দেশকে আরও শক্তিশালীভাবে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবেন, এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারা ও গোষ্ঠীর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারবেন।
সংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্যেই ইরান তাদের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনিকে নিয়োগ দিয়েছে। তার নিয়োগের মাধ্যমে ইরানকে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সংহত করা, নিরাপত্তা ও সামরিক কাঠামো শক্তিশালী রাখা, এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে। ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে মোজতবা খামেনির নাম ঘোষণার ঘটনা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ এবং ভবিষ্যতের কূটনৈতিক ও সামরিক নীতিকে প্রভাবিত করবে।