প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পূর্ব আফ্রিকার দেশ Kenya-তে টানা ভারী বৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যায় জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাজধানী Nairobiসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবল বর্ষণে সৃষ্ট বন্যায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকারি সূত্র। এছাড়া নিখোঁজ রয়েছেন আরও বহু মানুষ। তাদের খুঁজে বের করতে সেনাবাহিনী, দমকল বাহিনী এবং বিভিন্ন জরুরি উদ্ধারকারী দল দেশজুড়ে ব্যাপক তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, গত শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের কারণে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটে। কয়েক দিনের প্রবল বর্ষণে শহর ও গ্রামাঞ্চলের বহু এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। রাস্তাঘাট, সেতু ও বসতবাড়ি ডুবে যাওয়ায় মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছে। অনেকেই হঠাৎ করে পানির তোড়ে ভেসে যান, আবার অনেক গাড়ি ও যানবাহনও স্রোতে ভেসে গেছে।
রাজধানী নাইরোবির বিভিন্ন এলাকা এখনো পানিতে নিমজ্জিত। শহরের প্রধান সড়কগুলো ডুবে যাওয়ায় যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং ব্যবসায়ীরা চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন। বহু পরিবার তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এত স্বল্প সময়ে এত বেশি বৃষ্টি তারা অনেক বছর দেখেননি।
বন্যার ফলে পরিবহন ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে পানি জমে থাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। অনেক জায়গায় গাড়ি পানিতে ডুবে যায় কিংবা স্রোতে ভেসে যায়। উদ্ধারকারী দল এখন পর্যন্ত পানির তোড়ে ভেসে যাওয়া ১৭২টি যানবাহন উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, আরও অনেক গাড়ি এখনো পানির নিচে আটকে আছে।
এই দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে দেশের বিমান চলাচল ব্যবস্থাতেও। নাইরোবির প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কয়েকটি ফ্লাইট বিলম্বিত বা বাতিল করতে হয়েছে। রানওয়ের আশপাশে পানি জমে যাওয়ায় বিমানবন্দরের কার্যক্রম কিছু সময়ের জন্য ব্যাহত হয়। ফলে আন্তর্জাতিক যাত্রীদেরও ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।
উদ্ধারকাজ ত্বরান্বিত করতে কেনিয়ার সেনাবাহিনী এবং জরুরি সেবা সংস্থাগুলো যৌথভাবে কাজ করছে। নৌকা, হেলিকপ্টার এবং বিশেষ উদ্ধার সরঞ্জাম ব্যবহার করে পানিবন্দি মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও উদ্ধারকারী দলকে স্রোতের তীব্রতার কারণে চরম ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। তবুও নিখোঁজদের সন্ধানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
দেশটির জনসেবা মন্ত্রী Geoffrey Kirenga Ruku জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের দ্রুত উদ্ধার ও সহায়তা দিতে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। তিনি বলেন, “এই দুর্যোগ মোকাবিলায় আমরা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। যেসব এলাকায় মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন, সেখানে দ্রুত পৌঁছানোর জন্য বিশেষ উদ্ধার দল মোতায়েন করা হয়েছে।”
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছেন কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট William Ruto। তিনি জাতীয় খাদ্য মজুদ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য জরুরি খাদ্য সহায়তা বিতরণের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বন্যাকবলিত এলাকার মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তর করতে এবং তাদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে।
সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বন্যার কারণে বহু পরিবার তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছে। অনেক কৃষিজমি পানিতে ডুবে গেছে, ফলে খাদ্য উৎপাদনেও বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষকরা বলছেন, হঠাৎ এই বন্যা তাদের বছরের পরিশ্রম নষ্ট করে দিয়েছে। মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা ফসল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অনেকের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ধরনের অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক বন্যার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের বড় ভূমিকা রয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে পূর্ব আফ্রিকার আবহাওয়ার ধরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগে যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে মাঝারি বৃষ্টি হতো, এখন সেখানে অল্প সময়ের মধ্যে অত্যন্ত তীব্র বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এর ফলে নদী ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা দ্রুত উপচে পড়ে এবং আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরায়ণের ফলে অনেক শহরে প্রাকৃতিক জলাধার ও খাল বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ফলে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগ থাকে না। নাইরোবির ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। শহরের অনেক এলাকায় অপরিকল্পিত নির্মাণের কারণে পানি জমে থেকে বন্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
মানবিক সংকটের আশঙ্কাও বাড়ছে। পানিবন্দি মানুষদের জন্য নিরাপদ পানি, খাদ্য এবং চিকিৎসা সহায়তার প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা সতর্ক করছেন, দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা না পৌঁছালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
এই দুর্যোগের মধ্যেও অনেক সাধারণ মানুষ স্বেচ্ছায় উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা নৌকা ও অস্থায়ী ভেলা ব্যবহার করে পানিবন্দি প্রতিবেশীদের উদ্ধার করতে এগিয়ে আসছেন। সামাজিক সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবকরাও ত্রাণ বিতরণ এবং আশ্রয়কেন্দ্রে সহায়তা দিতে কাজ করছেন।
সামগ্রিকভাবে কেনিয়ার এই পরিস্থিতি পূর্ব আফ্রিকার জলবায়ু সংকটের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এই ধরনের চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও বাড়তে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়ন, জল ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের ওপর জোর দেওয়া জরুরি।
বর্তমানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দ্রুত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা এখন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।