প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রমজান মাসের শেষ দশক মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ফজিলতপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচিত। এই দশককে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। তিনি এই সময়ে ইবাদত-বন্দেগিতে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতেন এবং পরিবারের সদস্যদেরও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য উৎসাহিত করতেন। হাদিসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে যে রমজানের শেষ দশক ছিল তাঁর ইবাদতের গভীর সময়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এই সময়ের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করতেন। হাদিসে এসেছে, আয়েশা (রা.) বলেন, “রমজানের শেষ দশক এলে রাসুলুল্লাহ (সা.) রাত জেগে ইবাদত করতেন, পরিবারকে জাগিয়ে দিতেন এবং ইবাদতের জন্য কোমর শক্ত করে নিতেন।” এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে, তিনি এই দশককে নিজের জীবন ও আত্মার পরিপূর্ণ উন্নয়নের জন্য ব্যবহার করতেন। বেশি পরিমাণে নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও জিকিরের মাধ্যমে তিনি আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করতেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) শেষ দশকের রাতগুলোকে বিশেষভাবে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে কাটাতেন। নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে তিনি সারারাত ইবাদতে মশগুল থাকতেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, এই সময় তার ইবাদত স্বাভাবিক দিনের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। পরিবারের সবাইকে জাগিয়ে তিনি ইবাদতের পরিবেশে রাখতেন, যা তাঁর সুন্নাহ ও নেতৃত্বের অংশ হিসেবে বিবেচিত।
রমজানের শেষ দশকে এতেকাফ পালনও নবীজির গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন ছিল। তিনি মসজিদে অবস্থান করে একাগ্রতার সঙ্গে আল্লাহর ইবাদত করতেন। হাদিসে উল্লেখ আছে, তিনি শেষ দশকের সময় এতেকাফ করতেন যতদিন পর্যন্ত আল্লাহ তাঁকে মৃত্যুর সময় না দিতেন। এতেকাফের মাধ্যমে তিনি আল্লাহর সঙ্গে গভীর আত্মিক সংযোগ স্থাপন করতেন এবং সম্পূর্ণ সময়কে ইবাদতে ব্যয় করতেন। এটি মুসলিমদের জন্য এক অনন্য উদাহরণ, যা অনুসরণ করলে তারা আত্মিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হবে।
রামজানের শেষ দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধান। এটি এমন একটি রাত যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। কুরআন বলেন, নিশ্চয়ই আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি লাইলাতুল কদরে। আর তুমি কী জানো লাইলাতুল কদর কী? লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। নবীজি (সা.) শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদরের সন্ধান করার নির্দেশ দিয়েছেন। মুসলমানরা এই রাতগুলোতে ইবাদত ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু নিজে ইবাদত করতেন না, বরং পরিবারের সকল সদস্যকেও ইবাদতের জন্য উৎসাহিত করতেন। তিনি চাইতেন, পরিবারের সবাই একে অপরকে আল্লাহর ইবাদতে উদ্বুদ্ধ করুক। এই সুন্নাহ অনুসরণ করে মুসলমানরা পরিবারে ইবাদতের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেন। এটি একদিকে আত্মিক উন্নয়ন নিশ্চিত করে, অন্যদিকে সামাজিক ও নৈতিক উন্নয়নের পথ সুগম করে।
রমজানের শেষ দশক নবীজির জীবনচর্যার মাধ্যমে আমাদের শেখায়, আল্লাহর নৈকট্য লাভে নিয়মিত ইবাদত, নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া এবং এতেকাফের গুরুত্ব অপরিসীম। এই সময়ের প্রতি মনোযোগী হয়ে মুসলমানরা তাদের আত্মিক উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবারের মধ্যে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ বৃদ্ধিতে সক্ষম হয়।
এই দশককে যথাযথভাবে কাটানো মুসলমানদের জন্য বিশেষ ফজিলত লাভের সুযোগ এনে দেয়। লাইলাতুল কদরের সন্ধান এবং ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর আশীর্বাদ, ক্ষমা ও নৈকট্য প্রাপ্তি সম্ভব হয়। নবীজির জীবনী অনুসরণ করে মুসলমানরা এই মাহফিলে নিজেদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে এবং জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি সমৃদ্ধ করতে পারেন।
অতএব, রমজানের শেষ দশক শুধু সময় নয়; এটি ইবাদত, আত্মিক সমৃদ্ধি ও নৈতিক শিক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। নবীজির জীবনচর্যার মাধ্যমে আমরা শিখতে পারি, এই দশককে ইবাদতের মাধ্যমে পূর্ণ করা উচিত এবং লাইলাতুল কদরের সন্ধান করতে হবে। এই সময়ের প্রতি মনোযোগী মুসলমান জীবনে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন, আত্মার প্রশান্তি এবং নৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়।