প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো, বা নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এখনও প্রস্তাবনা ও পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। যদিও সরকার নীতিগতভাবে এ পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছে, চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে বাস্তবায়ন কিছুটা বিলম্বিত হতে পারে। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি, বিশেষ করে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় সরকার পে-স্কেল বাস্তবায়নকে নিয়ন্ত্রণ ও সতর্কতার সঙ্গে এগোতে চায়।
সরকারি চাকরিজীবীরা দ্রুত নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন এবং বেতন বৈষম্য নিরসনের দাবি জানাচ্ছেন। এই দাবিকে সমর্থন জানিয়ে সরকার ইতিমধ্যে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতিমধ্যেই আশ্বাস দিয়েছেন যে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে হলেও কার্যকর করা হতে পারে। তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে কমিশনের সব সুপারিশ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নাও হতে পারে। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার পরিকল্পিতভাবে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে চায় যাতে আর্থিক ভারসাম্য বজায় থাকে এবং সরকারি কর্মচারীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখোমুখি না হন।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান এবং পে কমিশনের প্রধান জাকির আহমেদ খান। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, এই বৈঠকে পে কমিশনের প্রতিবেদন ও সুপারিশ নিয়ে আলোচনা করা হয়। এর আগে ১৮ ফেব্রুয়ারি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছিলেন যে, পে-স্কেল সংক্রান্ত সুপারিশগুলো ভালোভাবে পর্যালোচনা করা হবে। তিনি বলেন, “আমাদের দেখতে হবে মোট অ্যামাউন্ট কত এবং কতটুকু বাস্তবায়ন সম্ভব। বর্তমান আর্থিক অবস্থায়, যেখানে দেশের ট্যাক্স রেভিনিউ ও ট্যাক্স-টু-জিডিপি রেশিও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ, এসব বিবেচনা করে আমাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কতটুকু কখন এবং কিভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।”
অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, আগামী অর্থবছর ২০২৬–২৭ থেকে নবম পে-স্কেল কার্যকর করার একটি প্রস্তাব রয়েছে। তবে বাস্তবে তা কতটা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে এখনই নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না। কারণ সরকারের আর্থিক সংকট আরও তীব্র হয়েছে, মূল্যস্ফীতির চাপও পুরোপুরি কমেনি, এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। চলতি অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে রাজস্ব ঘাটতি ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি পৌঁছেছে।
নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের এই সতর্কতা এবং ধীরে চলো নীতি মূলত অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির সমন্বয়। নতুন বেতন কাঠামো দ্রুত কার্যকর করতে না পারলেও, সরকার চায় যাতে সরকারি চাকরিজীবীরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন না হন। পে কমিশন ইতোমধ্যেই নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশসহ তাদের প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দিয়েছে, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে সেই প্রক্রিয়া এখনও শুরু হয়নি।
সাবেক অর্থ সচিব ও পে কমিশনের প্রধান জাকির আহমেদ খান জানিয়েছেন, কমিশনের দেওয়া প্রতিবেদন বাস্তবসম্মত এবং এর বাস্তবায়ন নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, সরকার দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা ও মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিয়ে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
গত বছরের ২৭ জুলাই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নের লক্ষ্যে ২১ সদস্যের একটি বেতন কমিশন গঠন করা হয়েছিল। ছয় মাসের মধ্যে কমিশনকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়, এবং সেই অনুযায়ী চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তারা তাদের সুপারিশ জমা দেয়। নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর এখনো পে-স্কেল বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়নি, তবে জাতীয় সংসদের আসন্ন অধিবেশনে বিষয়টি আলোচনায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, সরকারি বেতন কাঠামো পরিবর্তনের সময় আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। নবম পে-স্কেলের প্রস্তাবনা, কমিশনের সুপারিশ, এবং সরকারের ইতিবাচক অবস্থান সব মিলিয়ে একটি সতর্ক ও পরিকল্পিত বাস্তবায়নের পথ নির্দেশ করছে। এই প্রক্রিয়ার ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের বেতন কাঠামোর পরিবর্তনের প্রতীক্ষা অব্যাহত রাখতে পারবেন, এবং সরকারের পক্ষ থেকে নির্ধারিত সময়ে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা পেতে সক্ষম হবেন।