প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজারে আবারো ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা গেছে। বুধবার এবং বৃহস্পতিবার চলা বাণিজ্যিক লেনদেনে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম হঠাৎ করে তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং অবকাঠামোগত হামলার প্রভাব বাজারে দামের ওঠানামার মূল কারণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ জরুরি তেল মজুদ ছাড়ার ঘোষণা দিলেও এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা রোধ করতে পারিনি।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৯ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ৫০ সেন্টে পৌঁছেছে। এর আগে সোমবার দাম ব্যারেল প্রতি ১১০ ডলারের ওপর উঠে যায়। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ৮ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৯৪ ডলার ৯২ সেন্টে। এই বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যবস্থায় চলমান রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ইরানের অবকাঠামোগত হামলার প্রভাব সরাসরি তেলের বাজারে প্রতিফলিত হচ্ছে। এই অঞ্চল বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদনকারী, তাই কোনো অনিশ্চয়তা বা হঠাৎ বিপর্যয় আন্তর্জাতিক বাজারে সরাসরি দামের ওপর প্রভাব ফেলে। ফলে বিনিয়োগকারী, ট্রেডার এবং বিশ্লেষকরা দামের ভবিষ্যৎ গতিবিধি নিয়ে উদ্বিগ্ন।
দামের এই ওঠানামা শুধু আন্তর্জাতিক বাজারকে প্রভাবিত করছে না, বরং জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতিগুলোর জন্যও উদ্বেগের সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে এশিয়া, ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো তেল আমদানির উপর নির্ভরশীল দেশগুলোতে এ ধরনের হঠাৎ ঊর্ধ্বগতি ব্যয় বৃদ্ধি করে। গ্যাস ও বিদ্যুতের উৎপাদন খাতেও প্রভাব পড়ে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের দামের ওপর বোঝা হয়ে পড়ে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সরবরাহ চেইন ভাঙনের কারণে দাম বাড়ছে। তেলের উৎপাদনকারী দেশগুলোতে উৎপাদন সীমিত হওয়ায় এবং উৎপাদন-পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাচ্ছে। এই ঘাটতি ট্রেডার এবং ফিউচার মার্কেটে দামের ওঠানামা তীব্র করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তেলের দামের এই চূড়ান্ত বৃদ্ধি বিশ্ব বাজারে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
বিনিয়োগকারীদেরও এই পরিস্থিতি উদ্বেগে ফেলেছে। তেলের ফিউচার কন্ট্র্যাক্টে দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্টক এক্সচেঞ্জের অন্যান্য খাতে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে শক্তিশালী তেল সংস্থা এবং উৎপাদন খাতের সংস্থাগুলোতে বিনিয়োগকারীরা দামের ওঠানামার দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন।
অন্যদিকে, তেলের বাজারে এই ঊর্ধ্বগতি পেট্রোলিয়াম ভোক্তাদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যেসব দেশে জ্বালানি তেলের ওপর ভর্তুকি নেই বা সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারের দামকে স্থানীয় বাজারে প্রভাবিত করে, সেখানে জনগণ দ্রব্যমূল্যের চাপ অনুভব করতে শুরু করেছে। সাধারণ ভোক্তারা জানাচ্ছেন, ঘরে ঘরে গাড়ি চালানো, পণ্য পরিবহন ও দৈনন্দিন জীবনের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক তেল বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারে ভোলাটিলিটি এখন নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা সামরিক উত্তেজনা বাজারে দামের ওপর সশরীরে প্রভাব ফেলে। মধ্যপ্রাচ্যে অবকাঠামোগত হামলা এবং সরবরাহে অনিশ্চয়তা তেলের দামকে ১০০ ডলার লেভেলের ওপরে ঠেলে দিয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের অন্যান্য জ্বালানি পদার্থের দরেও ধাক্কা লাগে।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে উৎপাদনকারী দেশগুলোকে সরবরাহ চেইন সুসংহত করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে পর্যাপ্ত স্টক রাখা জরুরি, যাতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা প্রাকৃতিক ঝুঁকিতে বাজারে তীব্র ওঠানামা না ঘটে।
বাংলাদেশের মতো তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল দেশের জন্য এই ঊর্ধ্বগতি প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ইতিমধ্যেই প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে, যাতে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা-সরবরাহ ভারসাম্য বজায় থাকে।
বিশ্বের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করলে বিশ্ব অর্থনীতিতে সুনির্দিষ্ট প্রভাব পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারের এ ধরনের ঊর্ধ্বগতি দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি খাতের ওপর সরাসরি চাপ পড়ে এবং পণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে খরচ বৃদ্ধি পায়, যা সরাসরি দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য তেল আমদানিকারী দেশগুলো বিপর্যয় মোকাবেলায় জরুরি তেল মজুদ ছাড়ার উদ্যোগ নিয়েছে, তবে বাজারে দামের উপর তা প্রভাব ফেলার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে বাজারে স্থিতিশীলতা আনার জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে। ফলে আগামী সপ্তাহগুলো আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে।
সংক্ষেপে, তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে ঊর্ধ্বগতি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা, অবকাঠামোগত হামলা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাধা দিচ্ছে। বিনিয়োগকারী, সরকার এবং ভোক্তাদের জন্য এই পরিস্থিতি নতুন ভাবনার ও পরিকল্পনার প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, বাজারে নিয়ন্ত্রণ এবং স্থিতিশীলতার মাধ্যমে আগামীদিনে তেলের দাম সুনির্দিষ্টভাবে স্থিতিশীল হবে।