প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন খাতকে সঙ্কটের মুখে ফেলেছে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান উত্তেজনা। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিদিন এই অঞ্চলের ভ্রমণ ও পর্যটন খাতে গড়ে প্রায় ৬০ কোটি ডলার ক্ষতি হচ্ছে। এই ক্ষতির মূল কারণ হলো আকাশপথে যাতায়াতের ব্যাঘাত, পর্যটকদের মধ্যে আস্থার সংকট এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের বিঘ্ন।
বিশ্ব পর্যটনের প্রায় ৫ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক ট্রানজিট ট্রাফিকের ১৪ শতাংশ এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। দুবাই, আবুধাবি, দোহা এবং বাহরাইনের মতো প্রধান বিমানবন্দরগুলো স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক প্রায় ৫ লাখ ২৬ হাজার যাত্রী পরিচালনা করে। তবে চলতি দুই সপ্তাহ ধরে উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খলার কারণে বিমান চলাচলে ব্যাপক ব্যাঘাত দেখা দিয়েছে। ফলে অনেক আন্তর্জাতিক রুটে বিমান ভাড়া বেড়ে গেছে এবং পর্যটকদের ভ্রমণ পরিকল্পনা ব্যাহত হচ্ছে।
ডব্লিউটিটিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন খাতের আয়ের পূর্বাভাস ছিল প্রায় ২০ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। আন্তর্জাতিক পর্যটকের আগমন ও ভ্রমণ প্রবাহে যে কোনো ধরনের ব্যাঘাত দ্রুত এবং গভীরভাবে অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। শুধু বিমান চলাচলই নয়, হোটেল, স্থানীয় পরিবহন, ভ্রমণ সংস্থা ও বিভিন্ন পর্যটনসেবা খাতেও ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে দুবাই, আবুধাবি ও দোহার মতো পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে আয়ের বড় অংশ প্রতিদিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পর্যটকরা নিরাপত্তার কারণে ভ্রমণ এড়াচ্ছেন। সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমণকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছে। এসব শহরের অর্থনীতি পর্যটন খাতের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় দৈনিক ক্ষতি অর্থনীতিকে হুমকিতে ফেলছে। হোটেল ব্যবসায়ী, রেস্তোরাঁ ও গাইড সার্ভিসগুলো ইতিমধ্যেই বিপুল ক্ষতির মুখোমুখি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন খাতের পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক পর্যটকরা অন্যান্য নিরাপদ গন্তব্যের দিকে ঝুঁকবেন, যা অর্থনৈতিক ক্ষতির সঙ্গে অঞ্চলের ভাবমূর্তিকেও প্রভাবিত করবে। বিশেষ করে চলতি মৌসুমে পর্যটন সিজন সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকা অবস্থায় এই সংঘাতের প্রভাব সর্বাধিক।
ডব্লিউটিটিসি প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পর্যটন ইকোসিস্টেমে ব্যাঘাত শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় জীবিকা নিয়েও প্রভাব ফেলে। হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও ভ্রমণ সংস্থাগুলোর কর্মচারীরা প্রায়শই অস্থায়ীভাবে বেকার হয়ে পড়ছেন। এর ফলে সামাজিক চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বব্যাপী বিমান চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হওয়ায় এই সঙ্কট শুধু স্থানীয় নয়, বৈশ্বিক বিমান ও পর্যটন খাতকেও প্রভাবিত করছে। আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোকে রুট পরিবর্তন করতে হচ্ছে, বিমান ভাড়া বেড়েছে এবং কিছু ফ্লাইট বাতিল হতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে পর্যটকরা অন্যান্য অঞ্চলের নিরাপদ গন্তব্য খুঁজছেন।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, যদি রাজনৈতিক উত্তেজনা ও যুদ্ধে ব্যাঘাত অব্যাহত থাকে, তাহলে ২০২৬ সালের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হবে। পর্যটন খাতের ক্ষতির পরিমাণ কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করছে।
ডব্লিউটিটিসির মতে, স্থায়ী সমাধান ছাড়া এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে, পর্যটন খাত দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সম্মুখীন হবে। নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিস্থিতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছাড়া পর্যটক আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। ফলে মধ্যপ্রাচ্য সরকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
এই ক্ষতির প্রভাব শুধু দেশগুলোর আঞ্চলিক অর্থনীতির ওপর সীমাবদ্ধ নয়, আন্তর্জাতিক পর্যটন চাহিদা ও বৈশ্বিক যাত্রাপথেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে এই অঞ্চলের প্রধান পর্যটন শহরগুলোতে ব্যবসা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সব ক্ষেত্রেই চাপ বেড়ে গেছে। এই সংকট মোকাবেলায় নিরাপত্তা, পর্যটক আস্থা এবং অবকাঠামোগত প্রস্তুতি অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমণ ও পর্যটন খাতের জন্য এই সংকটই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আর্থিক ক্ষতি, কর্মসংস্থান সংকট, পর্যটক আস্থা হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ব্যাঘাত একসাথে মিলিয়ে একটি গভীর সংকট সৃষ্টি করছে। আন্তর্জাতিক পর্যটক এবং ব্যবসায়ীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।