প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর কাফরুলে বিধবা স্ত্রীকে বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের দায়ে মো. জাহাঙ্গীর হোসেন নামে এক যুবককে নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনাল সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে আমৃত্য কারাদণ্ড প্রদান করেছে। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) ঢাকার চার নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মুন্সী মো. মশিয়ার রহমান এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ের সঙ্গে আসামিকে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। বিচারক নির্দেশ দিয়েছেন, আদায়ে আসামির স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে টাকা ভিকটিমের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. এরশাদ আলম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, রায়ের পর তাকে সাজা পরোয়ানা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আদালত আরও নির্দেশ দিয়েছেন যে, আসামির সম্পত্তি থেকে ভিকটিমের পুত্রের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালন করা হবে, সন্তানের বয়স ২১ বছর না হওয়া পর্যন্ত। যদি সম্পত্তি থেকে ভরণ-পোষণ যোগানো সম্ভব না হয়, তবে রাষ্ট্র এই দায়িত্ব বহন করবে।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, আসামি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন এবং ভিকটিম পূর্বপরিচিত ছিলেন। ঘটনার ১১ মাস আগে ভিকটিমের স্বামী মৃত্যুবরণ করেন। এই পরিচয়ের সুবাদে আসামি ভিকটিমের বাসায় নিয়মিত আসা-যাওয়া করতেন। এক পর্যায়ে তারা প্রেমের সম্পর্ক তৈরি করেন। ২০১৮ সালের ১৫ জানুয়ারি রাতে কাফরুল থানাধীন ইব্রাহিমপুর এলাকার এক বাসায় আসামি ভিকটিমকে ইচ্ছার বিরুদ্ধভাবে ধর্ষণ করেন। এরপর ভিকটিম অভিযোগটি প্রকাশ করতে চাইলে আসামি তাকে বিয়ে করার আশ্বাস দেন।
যদিও বিভিন্ন সময় আসামি ভিকটিমকে বিয়ের প্রলোভন দিয়ে ধর্ষণ চালিয়ে যান, শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভিকটিম ধর্ষণের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্ত শেষে ২০১৯ সালের ২৫ নভেম্বর আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কাফরুল থানার উপপরিদর্শক আকলিমা আক্তার ছিলেন।
বিচারকালে রাষ্ট্রপক্ষ ৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া নবজাতক পুত্র সন্তানের ডিএনএ পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে, শিশুটি আসামি মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের। আদালতের এই রায়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা পাঠানো হয়েছে, যাতে অন্যরা অনুরূপ অপরাধে নিরুৎসাহিত হয়।
বিচারক এই রায়ে শুধু শাস্তি নির্ধারণ করেছেন না, বরং ভিকটিম এবং তার সন্তানদের সামাজিক ও আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্যও নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশে আসামির সম্পত্তি থেকে ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করা হবে, যা দেশের আইনি ব্যবস্থার মানবিক দিককেও প্রতিফলিত করে।
এই মামলার রায় আইনগত এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এটি নারী নির্যাতন এবং বৈবাহিক প্রলোভনে ঘটে যাওয়া শারীরিক ও মানসিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা পাঠাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভিকটিমের স্বতঃস্ফূর্ত সাহস এবং আইনের প্রতি বিশ্বাস আদালতের কঠোর রায়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বিচারক মুন্সী মো. মশিয়ার রহমান রায়ে উল্লেখ করেছেন যে, ধর্ষণ কোনো ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, এটি সামাজিক ও মানবিক বিচারের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুতর। বিশেষ করে বিধবা নারীদের উপর ঘটে যাওয়া এই ধরনের নির্যাতন সামাজিক এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়। তাই আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি আরোপ করা অপরাধ প্রতিরোধে একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।
মুখ্যত, এই রায় দেশের আইন প্রণয়ন ও নারীর নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশ প্রদান করেছে। সমাজে নারী নির্যাতন, বিয়ের প্রলোভন ব্যবহার করে যৌন অত্যাচারের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে প্রশাসন এবং আদালতের কঠোর মনোভাবের প্রমাণ হিসেবে এই রায় গণ্য হবে। ভিকটিমের স্বার্থে আদালতের মানবিক সিদ্ধান্ত এবং সম্পত্তি থেকে ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা দেশের আইনি প্রক্রিয়ার মানবিক ও ন্যায়সংগত দিককে তুলে ধরে।
রায়ের মাধ্যমে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় লঘু মনে করলে আইন কঠোরভাবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। এটি দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষা, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং সমাজে নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্বের গুরুত্বকেও প্রতিফলিত করছে। এই রায় শুধু ভিকটিমের জন্য নয়, সমাজের সকল স্তরের নারী ও শিশুদের জন্য আইনি সুরক্ষা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।