|
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৫ |একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
জার্মানি ও ইসরাইলের মধ্যকার দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে জার্মানি ইসরাইলে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি অব্যাহত রেখেছে। আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা এবং আইনগত চ্যালেঞ্জের মুখেও এ অস্ত্র রপ্তানি থেমে নেই। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বার্তা সংস্থা আনাদোলু জানায়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে জার্মানি প্রায় ২৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্র ইসরাইলে রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে।
জার্মান সরকারের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইসরাইলে রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া সামরিক সরঞ্জামের মোট মূল্য ছিল ১৮৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে আরও ৩২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার মূল্যের সরঞ্জাম রপ্তানি অনুমোদিত হয়। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ সত্ত্বেও জার্মানি তার ঐতিহাসিক অবস্থান থেকে সরে আসছে না।
জার্মান-ইসরাইল সম্পর্কের ভিত্তি অনেকাংশে গড়ে উঠেছে নাৎসি আমলের ইতিহাস ও হলোকাস্টের ভয়াবহ স্মৃতির উপর। জার্মান রাজনৈতিক নেতৃত্ব বহুবারই বলেছে, ইসরাইলের নিরাপত্তা তাদের “রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব”। এই ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার কারণেই জার্মানি বরাবরই ইসরাইলের প্রতি সহানুভূতিশীল থেকেছে—বিশেষ করে সামরিক ও নিরাপত্তাখাতে।
তবে এই অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্কিত হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে ইসরাইলের গাজা আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে। ২০২৩ সালের শেষদিকে ইসরাইল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করলে বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সংগঠন, পর্যবেক্ষক সংস্থা এবং বিভিন্ন রাষ্ট্র এর নিন্দা জানায়। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, চলমান এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত ৫৮ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। আহতের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে।
এই পটভূমিতে, নিকারাগুয়া ২০২৪ সালের শুরুতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) জার্মানির বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে। মামলায় অভিযোগ করা হয়, জার্মানি ইসরাইলে অস্ত্র সরবরাহ করে গাজায় গণহত্যাকে সহায়তা করছে। এই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে জার্মানি কিছু সময়ের জন্য ইসরাইলে অস্ত্র রপ্তানি সাময়িকভাবে স্থগিত করে।
তবে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন ঘটে যখন জার্মান সরকার জানায়, ইসরাইল আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলবে—এমন লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সেইসাথে, ইরানের সম্ভাব্য হুমকি এবং মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তার ভারসাম্য বজায় রাখার অজুহাতে আবারও অস্ত্র রপ্তানি চালু করে জার্মানি।
বিশ্লেষকদের মতে, জার্মান সরকারের এই অবস্থান ‘নৈতিক দ্বৈততা’র পরিচায়ক। একদিকে তারা শান্তির কথা বলছে, অন্যদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত অস্ত্র সরবরাহ করে যাচ্ছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং ইউরোপের বেশ কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন জার্মানির এ নীতির কড়া সমালোচনা করেছে।
জার্মানির একাধিক বেসরকারি সংগঠন, একাডেমিক প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাও সরকারের এই সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে দেখছেন। অনেকের মতে, ইসরাইলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ যখন আরও শক্তিশালী হচ্ছে, তখন একে সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে সমর্থন জানানো ভবিষ্যতে জার্মানির কূটনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে।
এদিকে, জার্মান সরকার এখনো নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। বরং তারা প্রতিনিয়ত ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকার কথা বলেই চলেছে। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই অবস্থান যে আরও গভীর আলোচনার জন্ম দেবে, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
গাজায় মানবিক বিপর্যয় যখন দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে, তখন জার্মানি–ইসরাইল সামরিক চুক্তি এবং অস্ত্র রপ্তানি নিয়ে বিতর্ক শুধু নৈতিক প্রশ্নই তুলে দিচ্ছে না, বরং এটি গোটা আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামো ও জবাবদিহির ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন