প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নওগাঁ জেলার দুটি পৃথক উপজেলায় বজ্রপাতে দুই কৃষকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে ধামইরহাট ও মান্দা উপজেলায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনাগুলো স্থানীয় মানুষের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এনেছে। কৃষিকাজ করতে গিয়ে হঠাৎ বজ্রপাতে প্রাণ হারানো এই দুই কৃষকের মৃত্যুতে তাদের পরিবার ও গ্রামবাসীদের মধ্যে গভীর শোক ও বেদনার সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সকালে আকাশে মেঘ জমে বৃষ্টি শুরু হলে অনেক কৃষকই তাদের জমি ও ফসলের দেখভাল করতে মাঠে যান। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ধামইরহাট উপজেলার ভাবির মোড় এলাকার কৃষক জালাল উদ্দীন বাড়ির পাশের একটি বিলে শসা তুলতে গিয়েছিলেন। কৃষিকাজে ব্যস্ত থাকার সময় হঠাৎ বজ্রপাত হলে ঘটনাস্থলেই তিনি গুরুতর আহত হন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়।
ঘটনাটি এতটাই আকস্মিক ছিল যে আশপাশে থাকা লোকজন কিছু বুঝে ওঠার আগেই সবকিছু ঘটে যায়। পরে স্থানীয়রা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে এসে জালাল উদ্দীনের নিথর দেহ উদ্ধার করেন। খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে তার মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যান। এই আকস্মিক মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
অন্যদিকে একই দিন সকালে নওগাঁর মান্দা উপজেলায় আরেকটি বজ্রপাতের ঘটনায় প্রাণ হারান পিন্টু নামের এক কৃষক। তিনি উপজেলার চকরামপুর মধ্যপাড়া ঈদগাহ সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা। স্থানীয়দের মতে, তিনি সেদিন সকালে নিজের ধানের জমিতে কাজ করছিলেন। হঠাৎ করে আকাশে বজ্রসহ বৃষ্টি শুরু হলে তিনি মাঠেই ছিলেন। ঠিক সেই সময় বজ্রপাত হলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
এই ঘটনায় পিন্টুর সঙ্গে থাকা আরেকজন ব্যক্তি গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করান। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকদের মতে, আহত ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
ধামইরহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মোখলেছুর রহমান জানান, বজ্রপাতের ঘটনায় একজন কৃষকের মৃত্যুর খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। প্রাথমিকভাবে এটি একটি প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তিনি বলেন, নিহত ব্যক্তির পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
এদিকে মান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাসুদ রানা বলেন, মাঠে ধানের জমিতে কাজ করার সময় বজ্রপাতে পিন্টু নামের এক কৃষক ঘটনাস্থলেই মারা যান। তিনি জানান, স্থানীয়রা আহত আরেকজনকে উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। পুলিশ বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই সময়টাতে প্রায়ই আকস্মিক বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে থাকে। বিশেষ করে কৃষিকাজে ব্যস্ত থাকার কারণে অনেক সময় কৃষকরা আবহাওয়ার ঝুঁকি উপেক্ষা করে মাঠে কাজ করতে বাধ্য হন। ফলে এমন দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
গ্রামবাসীদের অনেকেই বলেন, কৃষকেরা তাদের জীবিকার জন্য প্রতিদিন মাঠে কাজ করেন। কিন্তু বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কখন যে কার জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনে, তা কেউ আগে থেকে বুঝতে পারেন না। জালাল উদ্দীন ও পিন্টুর মৃত্যুতে এলাকাজুড়ে শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
নিহত জালাল উদ্দীন ছিলেন পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যদের একজন। তার মৃত্যুর খবর শোনার পর পরিবারে নেমে এসেছে শোক ও হতাশা। একইভাবে পিন্টুর পরিবারও গভীর শোকের মধ্যে রয়েছে। স্বজনরা বলছেন, সকালে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে গিয়ে এভাবে প্রাণ হারাবেন, তা তারা কল্পনাও করতে পারেননি।
আবহাওয়াবিদরা প্রায়ই বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠে কাজ না করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বজ্রপাতের সময় উঁচু জায়গা বা খোলা মাঠে থাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময় নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা এবং গাছের নিচে বা ধাতব বস্তু থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশে প্রতি বছর বজ্রপাতে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে থাকে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় কৃষিকাজে যুক্ত মানুষেরা এ ধরনের ঝুঁকির মধ্যে বেশি থাকেন। এ কারণে বিভিন্ন সময় সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নওগাঁর ধামইরহাট ও মান্দা উপজেলার এই দুই কৃষকের মৃত্যু আবারও সেই বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে দিল। স্থানীয় প্রশাসন ও সচেতন মহল মনে করছে, বজ্রপাতের ঝুঁকি সম্পর্কে আরও সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা কমানো সম্ভব হয়।