যুক্তরাষ্ট্র-বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে কঠোর সমালোচনায় আনু মুহাম্মদ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬
  • ৩ বার
যুক্তরাষ্ট্র-বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে কঠোর সমালোচনায় আনু মুহাম্মদ

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আবারও সমালোচনামুখর বক্তব্য দিয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক Anu Muhammad। তাঁর মতে, আলোচিত এই বাণিজ্যচুক্তিতে বাংলাদেশের কোনো প্রকৃত অগ্রাধিকার নেই; বরং এতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি মনে করেন, জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষা করে এমন চুক্তি করা হলে তা দেশের অর্থনীতি, শিল্পখাত ও নীতিনির্ধারণের স্বাধীনতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

শুক্রবার রাজধানীর বিজয়নগরে অবস্থিত Economic Reporters Forum মিলনায়তনে আয়োজিত ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি কেন বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক’ শীর্ষক এক সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব মন্তব্য করেন। গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি আয়োজিত এই সেমিনারে অর্থনীতি, আইন ও উন্নয়ন গবেষণার বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন এবং সম্ভাব্য চুক্তির নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেন।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন International University of Business Agriculture and Technology-এর অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক গোলাম রসুল। এছাড়া বক্তব্য দেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, উন্নয়ন অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা করা বিশ্লেষক মাহা মির্জা এবং University of Dhaka-এর অ্যাকাউন্টিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা। আলোচকরা বাণিজ্যচুক্তির অর্থনৈতিক, আইনগত এবং নীতিগত প্রভাব নিয়ে বিশদ মতামত তুলে ধরেন।

সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে আনু মুহাম্মদ বলেন, প্রস্তাবিত বাণিজ্যচুক্তি পর্যালোচনা করলে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে এতে বাংলাদেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। তাঁর ভাষায়, একটি স্বাধীন দেশের বাণিজ্যচুক্তি এমন হওয়া উচিত যেখানে উভয় পক্ষের স্বার্থ সমানভাবে বিবেচিত হবে। কিন্তু আলোচিত এই চুক্তিতে বাংলাদেশের শিল্পখাত, আমদানি-রপ্তানি নীতি এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দেশের রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলে। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচনী রাজনীতিতে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানটি বেশ আলোচিত ছিল। তাঁর মতে, যদি সত্যিই দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তাহলে এই ধরনের চুক্তি নিয়ে সরকারকে আরও সতর্ক হতে হবে এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

আনু মুহাম্মদের বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে আসে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ। তিনি দাবি করেন, চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার আগেই তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু সদস্য এর বাস্তবায়নে অস্বাভাবিক আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। এমনকি জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর মতে, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্থনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে জনমত, সংসদীয় আলোচনা এবং সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর মতামত বিবেচনা করা জরুরি ছিল।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, চুক্তি প্রক্রিয়ায় জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন খলিলুর রহমান ছিলেন এবং পরবর্তীতে তাঁকে সরকারে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চুক্তির পক্ষে সরকারি পর্যায়ে যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

আনু মুহাম্মদ বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের বড় উৎস। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম প্রধান বাজার হলেও সেখানে বাংলাদেশকে তুলনামূলক বেশি শুল্ক দিতে হয়। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই বাংলাদেশকে বাণিজ্য সুবিধা দিতে চাইত, তাহলে প্রথমেই শুল্কহারের বিষয়টি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া যেত।

তিনি উল্লেখ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এখনো বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের জন্য নির্ধারিত বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা দেয়নি। ফলে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের জন্য গড়ে প্রায় ১৬ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়, যা অনেক প্রতিযোগী দেশের তুলনায় বেশি। তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতিতে নতুন বাণিজ্যচুক্তি বাংলাদেশের জন্য কতটা উপকারী হবে, তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন।

সেমিনারে বক্তারা আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচুক্তি অনেক সময় দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। একটি চুক্তির মাধ্যমে যদি কোনো দেশকে নির্দিষ্ট পণ্য আমদানি বা রপ্তানিতে বাধ্য করা হয়, তাহলে সেই দেশের নিজস্ব শিল্পনীতি ও বাজার কাঠামোতে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। ফলে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।

এছাড়া আনু মুহাম্মদ চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল নিয়ে পূর্ববর্তী সময়ে চুক্তির উদ্যোগের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এ বিষয়টি নিয়ে কিছু মানুষের মধ্যে অস্বাভাবিক তৎপরতা দেখা গিয়েছিল। তবে শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে সেই চুক্তি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। তাঁর মতে, জাতীয় সম্পদ ও অবকাঠামো নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দেশের মানুষের মতামত এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করা জরুরি।

সেমিনারে অংশ নেওয়া অন্যান্য বক্তারাও বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আরও স্বচ্ছতা এবং জনসম্পৃক্ততার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। তারা বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নয়ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে তা যেন দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং শিল্প উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে টিকে থাকতে বাংলাদেশকে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করতে হবে। তবে সেই চুক্তি কতটা ভারসাম্যপূর্ণ এবং দেশের অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে কতটা লাভজনক হবে, তা নিয়ে গভীর গবেষণা ও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

সব মিলিয়ে সেমিনারে বক্তারা মনে করেন, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচুক্তি শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক, সামাজিক এবং কৌশলগত বাস্তবতার সঙ্গেও জড়িত। তাই এমন যেকোনো চুক্তি করার আগে সংসদে আলোচনা, বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং জনস্বার্থের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আনু মুহাম্মদের বক্তব্যে এই উদ্বেগই সবচেয়ে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। তাঁর মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং নীতিনির্ধারণের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য বাণিজ্যচুক্তি বিষয়ে আরও স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে রাখার প্রয়োজন রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত