প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
একাদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসন বণ্টন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে এখনো উত্তেজনা বিরাজ করছে। ২০০৪ সালের জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত নারী আসন) নির্বাচন আইনের আওতায় এই বণ্টন নির্ধারিত হচ্ছে। প্রতি ছয়টি সাধারণ আসনের জন্য এক নারী আসন বরাদ্দ থাকায়, মোট ২৯৭টি সাধারণ আসনের ভিত্তিতে ৫০টি সংরক্ষিত আসন নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল ও জোটের মধ্যে এই আসনগুলোর ভাগবণ্টন করা হবে।
বিএনপি জোটের প্রাপ্ত আসন সংখ্যা ২১২। আইনের ধারা অনুযায়ী তাদের প্রাপ্য নারীর আসনের সংখ্যা গণনা করলে প্রাপ্ত ফলাফল দাঁড়ায় ৩৫ দশমিক ৬৯। এই ভগ্নাংশ আইনের ধারা ৪ অনুযায়ী পূর্ণসংখ্যায় রূপান্তরিত হলে, বিএনপি জোট ৩৬ নারী আসন পাবে। অন্যদিকে জামায়াত-এনসিপির জোট ৭৭টি আসন পেয়েছে। তবে এনসিপি আলাদাভাবে নারী আসনের নির্বাচনে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত ও খেলাফত মজলিসকে সঙ্গে রাখলে জামায়াত জোটের মোট আসন দাঁড়াবে ৭১, যার প্রাপ্য নারীর আসন ১১ দশমিক ৯৫। আইন অনুসারে ভগ্নাংশ পূর্ণসংখ্যায় রূপান্তরিত হলে জোটটি ১২ নারী আসন পাবে। এনসিপির এক আসনও নির্ধারিতভাবে প্রাপ্ত।
স্বতন্ত্র সাতজন এমপি যদি নিজেদের মধ্যে জোটবদ্ধ হন, তবে তাদের প্রাপ্য আসন ১ দশমিক ১৭ হিসেবে গণ্য হবে। তবে আইনের ধারা অনুযায়ী, দশমিক ৫-এর বেশি হলে পূর্ণসংখ্যায় রূপান্তরিত হয়। তাই স্বতন্ত্ররা জোটবদ্ধ না হলে তাদের আসন সর্বাধিক নারী আসনপ্রাপ্ত দলের কাছে চলে যাবে। এ ক্ষেত্রে বিএনপি জোট এই আসন পাবে। যদি স্বতন্ত্ররা বিএনপিতে যোগ দেন, তবে বিএনপির নারী আসনের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৩৭।
আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নির্বাচন কমিশন সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য দল বা জোটভিত্তিক তালিকা প্রস্তুত করবে। স্বতন্ত্র এমপিরা কোনো দলে যোগ দিতে পারবে, বা নিজেরা জোট গঠন করতে পারবে। এই তালিকা নারী আসনের নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত পরিবর্তনযোগ্য নয়।
একাদশ সংসদে নির্বাচিত স্বতন্ত্র এমপিরা জোটবদ্ধ হয়ে একটি আসন পেয়েছিলেন, দশম সংসদে ১৬ স্বতন্ত্র এমপি তিনটি আসন ভাগাভাগি করেছিলেন। তবে দ্বাদশ সংসদে ৬২ জন স্বতন্ত্র এমপি জোট না করে নিজস্বভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। বর্তমান নির্বাচনে স্বতন্ত্র সাত এমপির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের আসন গণনা করা হবে।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর একাধিক সাধারণ আসন থেকে নির্বাচিত হওয়ার বিষয়ও নারীর আসন বণ্টনে প্রভাব ফেলেছে। তারেক রহমান দুইটি সাধারণ আসন থেকে জয়ী হয়েছেন, যার মধ্যে তিনি বগুড়া-৬ ছাড়িয়ে ঢাকা-১৭ থেকে প্রতিনিধিত্ব করছেন। তবে নারীর আসন বণ্টনে নির্বাচিত প্রতিটি আসনকে গণনা করতে হবে। ফলে বিএনপির আসন সংখ্যা কমলেও বগুড়া-৬-এর আসন নারীর আসনের হিসাবের ক্ষেত্রে গণনা করা হবে।
নারী আসন বণ্টনের গণনা পদ্ধতিতে গণনা করা হয় দল বা জোটের মোট আসনকে সংসদের মোট সাধারণ আসন দিয়ে ভাগ করে প্রাপ্ত ভগ্নাংশকে গুণ করা হয়। ভগ্নাংশ দশমিক ৫-এর বেশি হলে পূর্ণসংখ্যায় রূপান্তরিত হয়। এই নিয়ম অনুযায়ী, বিএনপি জোটের প্রাপ্ত ৩৫ দশমিক ৬৯ আসন ৩৬ হিসেবে গণ্য হবে। জামায়াত-এনসিপির জোটও ১১ দশমিক ৯৫ আসন ১২ হিসেবে গণ্য হবে।
নারী আসন বণ্টনের এই প্রক্রিয়া দেশের রাজনৈতিক কাঠামোর স্বচ্ছতা এবং সংরক্ষিত আসনের মূল উদ্দেশ্য—নারীদের সংসদে যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা—কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছে। সংরক্ষিত নারী আসনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায় এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায় নারীর উপস্থিতি দৃঢ় হয়।
এবারের নির্বাচনে স্বতন্ত্র এমপিরা কোন পথে এগোবেন, তা এখনও নির্ধারিত হয়নি। তাদের সিদ্ধান্ত নারী আসনের শেষ বণ্টন ও রাজনৈতিক জোটগুলোর কাঠামোর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। নারীর আসন বণ্টন কেবল সংখ্যার বিষয় নয়; এটি সংসদে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, দলের নীতি নির্ধারণে অংশগ্রহণ এবং জাতীয় নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকার প্রমাণ।
বৃহৎ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, বিএনপি জোটের ৩৬ এবং জামায়াত-এনসিপির ১৩ নারী আসন দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্য ও সংরক্ষিত আসনের মৌলিক উদ্দেশ্য—নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণে—এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে ধরা হচ্ছে। স্বতন্ত্র এমপিদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এই বণ্টন চূড়ান্ত হবে, যা একদিকে সংরক্ষিত আসনের নিয়মাবলী প্রতিফলিত করবে এবং অন্যদিকে সংসদে নারীর প্রভাবশালী উপস্থিতি নিশ্চিত করবে।