খাল খনন ছাড়া নদী রক্ষা অসম্ভব: পাটওয়ারী

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬
  • ৩ বার
খাল খনন

প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চাঁদপুরে আয়োজিত এক ইফতার মাহফিলে নদী রক্ষা, পরিবেশ সংকট এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। নদী ও খালকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নদী টিকিয়ে রাখতে হলে খাল পুনঃখনন এখন আর বিকল্প নয় বরং এটি একটি অপরিহার্য জাতীয় দায়িত্বে পরিণত হয়েছে।

বুধবার (১৮ মার্চ) চাঁদপুর প্রেসক্লাব মিলনায়তনে স্থানীয় এনসিপি আয়োজিত ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি দেশের নদী ব্যবস্থার বর্তমান সংকটকে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে তুলে ধরেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের প্রধান নদীগুলো ক্রমশই প্রাণশক্তি হারাচ্ছে এবং এর পেছনে অব্যবস্থাপনা, দখলদারিত্ব এবং অবৈধ বালু উত্তোলনের মতো কর্মকাণ্ড সরাসরি দায়ী।

তিনি বলেন, নদী শুধু পানি প্রবাহের উৎস নয় বরং এটি দেশের পরিবেশ, কৃষি, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি জীবন্ত ব্যবস্থা। নদীর সঙ্গে সংযুক্ত খালগুলো যদি ভরাট হয়ে যায় অথবা অকার্যকর হয়ে পড়ে তাহলে সেই নদী ধীরে ধীরে মৃতপ্রায় হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতা অনুধাবন করেই তিনি জোর দিয়ে বলেন, খাল খননের বিষয়টি এখন জাতীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকা উচিত।

পাটওয়ারী দেশের বিভিন্ন নদীর বর্তমান অবস্থার উদাহরণ টেনে বলেন, উত্তরের তিস্তা থেকে শুরু করে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার মতো বৃহৎ নদীগুলো কোথাও পানিশূন্য হয়ে পড়ছে আবার কোথাও ভয়াবহ ভাঙনের শিকার হচ্ছে। এই দুই ধরনের সংকটই দেশের মানুষের জন্য মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। একদিকে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে অন্যদিকে নদীভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।

তিনি বিশেষভাবে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, কিছু প্রভাবশালী মহল নদী থেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বালু উত্তোলন করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে বিপর্যস্ত করছে। এতে নদীর তলদেশ অস্বাভাবিকভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং আশপাশের জনপদ ভেঙে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এই ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয় বরং এটি সরাসরি জননিরাপত্তার জন্যও হুমকি।

তার বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল জাতীয় ঐক্যের আহ্বান। তিনি বলেন, নদী রক্ষার মতো একটি মৌলিক বিষয়ে রাজনৈতিক বিভাজন অপ্রাসঙ্গিক। দেশের সকল রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, পরিবেশবিদ এবং সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তিনি মনে করেন, নদী রক্ষা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া এবং এটি সফল করতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কোনো পথ নেই।

সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রসঙ্গেও তিনি কথা বলেন। কোটা পদ্ধতি নিয়ে অতীতের আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি দাবি করেন, মেধাভিত্তিক নিয়োগের জন্য যে আন্দোলন হয়েছিল তা বাস্তবে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। তার অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে এখনো কোটা নির্ভর নিয়োগ দেখা যাচ্ছে যা তরুণ সমাজের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে। তিনি বলেন, এই বৈপরীত্য দূর করতে হলে নীতিগত সংস্কার প্রয়োজন।

চাঁদপুরের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তার বক্তব্যে ক্ষোভের সুর স্পষ্ট ছিল। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই জেলায় শিক্ষামন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার গুণগত মানে প্রত্যাশিত উন্নতি ঘটেনি। শিক্ষার মানোন্নয়ন ছাড়া একটি অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন। স্থানীয় শিক্ষার এই দুরবস্থা তাকে ব্যথিত করেছে বলে জানান তিনি।

সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়েও সমালোচনামূলক অবস্থান প্রকাশ করেন পাটওয়ারী। তার বক্তব্যে অতীত ও বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় এবং তিনি ইঙ্গিত দেন যে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সমালোচনার পাশাপাশি তিনি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরেন এবং বলেন, পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চাঁদপুর সদর উপজেলা এনসিপির সমন্বয়ক তামিম খান। এছাড়া কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী নেতা এবং গণমাধ্যমকর্মীরা। বিএনপি ছাড়া প্রায় সব দলের অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানটিকে একটি বহুমাত্রিক আলোচনার পরিসরে পরিণত করে।

এদিকে, অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট দিয়ে ব্যক্তিগত অবস্থানের ইঙ্গিত দেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ভবিষ্যতে তিনি অপ্রয়োজনীয় বা কাউকে আঘাত করতে পারে এমন মন্তব্য থেকে বিরত থাকবেন। এই ঘোষণার প্রেক্ষিতে তার বক্তব্যের ভাষা ও উপস্থাপন নিয়েও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও বাস্তবে নদী ব্যবস্থাপনায় নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অপরিকল্পিত উন্নয়ন, দখল, দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মিলিয়ে নদীগুলো ক্রমেই সংকটে পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে খাল পুনঃখনন এবং নদী সংরক্ষণ নিয়ে পাটওয়ারীর বক্তব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত আলোচনার সূত্রপাত করতে পারে।

সামগ্রিকভাবে তার বক্তব্যে পরিবেশ রক্ষা, সুশাসন এবং জাতীয় ঐক্যের বার্তা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। নদী ও খালকে কেন্দ্র করে দেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত