প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রথম ঈদুল ফিতরকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন পর সরকার গঠন করা বিএনপির জন্য এবারের ঈদ কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এটি জনসংযোগ জোরদার এবং তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতিতে ‘ঈদ রাজনীতি’ এখন বেশ জমে উঠেছে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় ছুটে গেছেন ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি নিতে। কেউ রাজধানীতে অবস্থান করলেও অধিকাংশই তৃণমূল পর্যায়ে গিয়ে জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনে ব্যস্ত সময় পার করছেন। পাড়া-মহল্লায় উপহারসামগ্রী বিতরণ, কুশল বিনিময় এবং বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যেন নতুন মাত্রা পেয়েছে।
বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দীর্ঘ দেড় যুগ পর দেশের মাটিতে ঈদ উদযাপন করতে যাচ্ছেন, যা দলটির জন্য একটি প্রতীকী গুরুত্ব বহন করছে। ঈদের দিন সকালে জাতীয় ঈদগাহে নামাজ আদায়ের পর তিনি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় যাবেন এবং সেখানে কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন। এরপর দিনশেষে তিনি শেরেবাংলা নগরে তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানিয়েছেন, ঈদের দিন সকাল ১০টায় যমুনায় আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠিত হবে। এ আয়োজনকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান রাজধানীর মিরপুরে ঈদের নামাজ আদায় করবেন এবং সেখানেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন। পরবর্তীতে তিনি কূটনীতিক ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলাদা করে মতবিনিময়ে অংশ নেবেন। তার এই কর্মসূচিও রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জামায়াতের অন্যান্য শীর্ষ নেতারাও নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান করে ঈদ উদযাপন করবেন। একইভাবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম চরমোনাইয়ে ঈদের জামাতে অংশ নেবেন এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন। এসব আয়োজন স্থানীয় রাজনীতিকে আরও সক্রিয় করে তুলছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারাও পিছিয়ে নেই। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঢাকায় ঈদ উদযাপন করবেন এবং জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখবেন। অন্যদিকে দলের বিভিন্ন নেতা নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় গিয়ে ঈদের মাধ্যমে গণসংযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।
বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দলের অধিকাংশ সিনিয়র নেতা রাজধানীতে ঈদ উদযাপন করলেও পরে তারা নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে জনগণের সঙ্গে সময় কাটাবেন। তবে কিছু ব্যতিক্রমও রয়েছে। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী চট্টগ্রামে ঈদ করবেন এবং আরেক নেতা মির্জা আব্বাস চিকিৎসার জন্য বিদেশে অবস্থান করছেন।
নতুন সংসদ গঠনের পর বিএনপির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন মুখ এবার প্রথমবারের মতো ঈদে নিজ নিজ এলাকায় জনপ্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত হচ্ছেন। এতে তাদের জন্য জনগণের প্রত্যাশা পূরণের একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, উপহার বিতরণ এবং সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে তারা নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন।
জনপ্রতিনিধিরা ঈদ উপলক্ষে শাড়ি, থ্রি-পিস, খাদ্যসামগ্রী এবং নগদ অর্থ বিতরণ করছেন। পাশাপাশি মসজিদে অনুদান দেওয়া, রাস্তা সংস্কার এবং স্থানীয় সংগঠনের সঙ্গে মতবিনিময় সভার আয়োজন করছেন। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা সাধারণ মানুষের কাছে নিজেদের উপস্থিতি জোরদার করছেন।
দলীয় সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণভান্ডার থেকেও বিভিন্ন এলাকায় উপহারসামগ্রী পাঠানো হয়েছে, যা বিতরণের মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে রমজানজুড়ে ইফতার পার্টি এড়িয়ে দরিদ্র মানুষের পাশে থাকার নির্দেশনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ঈদকে ঘিরে এই জনসংযোগ কার্যক্রম তৃণমূল রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় দলীয় কোন্দল রয়েছে, সেখানে ঐক্য ফিরিয়ে আনতে এই সময়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীরাও মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন।
স্থানীয়দের অনেকে বলছেন, জনপ্রতিনিধিদের এমন সরব উপস্থিতি তাদের সমস্যাগুলো সরাসরি তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করছে। একই সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগির মাধ্যমে জনগণ ও নেতাদের মধ্যে দূরত্ব কমছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, জাতীয় নির্বাচনের পর প্রথম ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন গতি সৃষ্টি হয়েছে। এই ‘ঈদ রাজনীতি’ কেবল উৎসবকেন্দ্রিক নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল ও তৃণমূল সংগঠনকে শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।