ছয় লাখ মুসল্লির ঢলে শোলাকিয়া ময়দান ইতিহাসের সাক্ষী

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২১ মার্চ, ২০২৬
  • ৩২ বার
শোলাকিয়া ময়দান

প্রকাশ: ২১ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভোরের কুয়াশা কাটতেই যেন এক বিশাল সমুদ্রের মতো পরিণত হয় কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান। দেশের বৃহত্তম ও প্রাচীন ঈদ জামাতে শনিবার (২১ মার্চ) অংশ নেন ছয় লাখেরও বেশি মুসল্লি, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে এক নজিরবিহীন সমাগম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ১৯৯তম ঈদুল ফিতরের এই জামাত ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, সৌহার্দ্য এবং কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেই শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়।

জামাতের ইমামতি করেন মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ ছাইফুল্লাহ, শহরের বড়বাজার জামে মসজিদের খতিব। তার কণ্ঠে পবিত্র নামাজের আবাহনে পুরো ময়দান যেন এক ধরনের আধ্যাত্মিক শক্তিতে ঘেরা হয়ে ওঠে। জেলা প্রশাসক ও শোলাকিয়া ঈদগাহ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা জানিয়েছেন, দেশের ৬৪ জেলা ছাড়াও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের মুসল্লিরা জামাতে অংশগ্রহণ করেন। আগত মুসল্লিদের বিপুল উপস্থিতি এবারের জামাতকে সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম বৃহৎ সমাগমে পরিণত করেছে।

ঈদের আগের দিন থেকেই কিশোরগঞ্জমুখী মানুষের ঢল নেমে আসে। কেউ আত্মীয়ের বাসায় রাত কাটান, কেউ মসজিদে, আবার অনেকে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটান, শুধু এক সঙ্গে ঈদের নামাজ আদায়ের আকাঙ্ক্ষায়। সকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঈদগাহ ময়দান কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। জায়গা না পেয়ে আশপাশের সড়ক, ভবনের ছাদ, এমনকি নরসুন্দা নদীর তীরেও মুসল্লিরা দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন।

শোলাকিয়ার ঐতিহ্য অনুযায়ী, জামাত শুরুর ১০ মিনিট আগে পাঁচটি, ৫ মিনিট আগে তিনটি এবং ১ মিনিট আগে দুটি শটগানের ফাঁকা গুলি ছুড়ে মুসল্লিদের জামাতে দাঁড়ানোর সংকেত দেওয়া হয়। এই প্রথা ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে আবদ্ধ, যা প্রতিটি মুসল্লিকে ঐক্যবদ্ধভাবে নামাজ আদায়ে অংশ নিতে উৎসাহিত করে।

জামাত শেষে দেশ ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি, অগ্রগতি এবং বিশেষ করে ফিলিস্তিনের মুসলমানদের জন্য মোনাজাত করা হয়। এই মিলনমেলা কেবল নামাজের অনুষ্ঠান নয়, বরং ভ্রাতৃত্ব, ঐক্য এবং বিশ্বাসের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে উদ্ভাসিত হয়। পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. শরীফুল আলম, কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম সহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গও জামাতে অংশ নেন।

নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা প্রতিটি প্রবেশপথ, ময়দানের আশেপাশের সড়ক এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালন করেন। এর ফলে এত বিপুল জনসমাগমের মধ্যেও জামাত শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ছয় লাখ মুসল্লির একসাথে উপস্থিতি কেবল ধর্মীয় সমাবেশের সীমা অতিক্রম করেছে। এটি সামাজিক সংহতি, জাতীয় ঐক্য এবং ভ্রাতৃত্বের প্রতীক হিসেবে কাজ করছে। প্রতিটি মুসল্লি এখানে কেবল নামাজের আনন্দ নিয়েই আসে না, বরং পারস্পরিক সংযোগ ও সম্প্রীতির অনুভূতিও গ্রহণ করে।

শোলাকিয়া ময়দান প্রতিটি ঈদে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষের মিলনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। তবে এবারের জামাতের আকার, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা এবং শান্তিপূর্ণ আয়োজন এটিকে ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান দিয়েছে। মুসল্লিরা এখানে কেবল ধর্মীয় শিক্ষা নয়, বরং সামাজিক সহমর্মিতা, শৃঙ্খলা এবং জাতীয় ঐক্যের শিক্ষা গ্রহণ করেন।

সবশেষে বলা যায়, শোলাকিয়া ঈদগাহে ছয় লাখ মুসল্লির উপস্থিতি কেবল সংখ্যা নয়, বরং দেশের বৃহত্তম ধর্মীয় ও সামাজিক ঐক্যের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত ভ্রাতৃত্ব, বিশ্বাস এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বার্তা বহন করে, যা ভবিষ্যতেও দেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে শক্তিশালী প্রভাব রাখতে সক্ষম।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত