শিশুর বয়সভেদে আচরণগত পার্থক্য ও অভিভাবকের করণীয়: বেড়ে ওঠার পথে সহমর্মিতা ও সচেতনতা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৮ জুলাই, ২০২৫
  • ৪২ বার

 

প্রকাশ: ১৮ জুলাই | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

শিশু জন্মের পর থেকেই তার আচরণ, অনুভূতি ও মানসিকতা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তনের গতিপথ নির্ভর করে তার বয়স, পারিপার্শ্বিকতা, পারিবারিক পরিবেশ এবং অভিভাবকের সাড়া দেওয়ার ধরণ ও ধৈর্যের ওপর। শিশুরা একেক বয়সে একেক রকমভাবে নিজের জগৎ তৈরি করে—তাদের অনুভব, প্রতিক্রিয়া ও আচরণ তাই বয়সভেদে স্বাভাবিকভাবে ভিন্ন হয়ে থাকে। তবে অধিকাংশ অভিভাবকই এই পরিবর্তনগুলোকে ঠিকঠাকভাবে অনুধাবন না করে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন কিংবা অপ্রয়োজনীয় শাসন প্রয়োগ করে ফেলেন, যা শিশুর মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।

জন্ম থেকে শুরু করে কৈশোর পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই শিশুরা নানা মনস্তাত্ত্বিক ও আচরণগত পর্যায়ের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়। জন্ম থেকে ১ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু মূলত তার আশপাশের পরিবেশকে অনুভব করতে শেখে। এই সময় মায়ের কণ্ঠস্বর, উষ্ণতা এবং দৃষ্টিসংযোগ শিশুর মস্তিষ্কে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। একটু কান্নাকাটি, ভয়ের প্রতিক্রিয়া কিংবা অপরিচিত মুখ দেখে উদ্বেগ—এসবই এই বয়সে স্বাভাবিক আচরণ। এমন সময়ে শিশুকে বেশি করে কোলে রাখা, কথা বলা এবং চোখে চোখ রেখে হাসা তার আত্মবিশ্বাস গঠনের প্রথম ধাপ তৈরি করে।

১ থেকে ৩ বছর বয়সে শিশু ধীরে ধীরে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে শেখে। “না” বলা, একগুঁয়েমি করা কিংবা খেলনা না পেলে রাগ দেখানো—এসব আচরণ এই বয়সের মানসিক বিকাশের অংশ। এসময় তারা আত্মপরিচয়ের খোঁজে থাকে এবং নতুন কিছু শিখতে আগ্রহী হয়। এই বয়সে অতিরিক্ত বাধা না দিয়ে নিরাপদ পরিবেশে শিশুকে নতুন জিনিস আবিষ্কার করার সুযোগ দিতে হবে। সহনশীলতা ও ধৈর্য নিয়ে তার আবেগকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে।

৪ থেকে ৬ বছর বয়সে শিশুরা গল্প শুনতে ভালোবাসে, কল্পনার জগতে বিচরণ করে, মিথ্যা বলে ফেলে কিংবা নিজের মতো করে সত্য সাজায়। তারা কখনো কখনো “অন্যের মতো” হতে চায় এবং সহপাঠীর আচরণ অনুকরণ করে। এই সময় তাদের মূল্যবোধ ও সামাজিক দক্ষতা গঠনের সূচনা ঘটে। অভিভাবকদের দায়িত্ব হবে এই বয়সে শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানো, তাদের অনুভূতির প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং ভালো আচরণের মডেল হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করা।

৭ থেকে ১০ বছর বয়সে শিশুদের যুক্তির শক্তি বাড়ে, আত্মসম্মানবোধ গড়ে ওঠে। তারা স্কুলজীবনে প্রবেশ করে এবং নিজের অবস্থান বুঝতে শেখে। এই বয়সে চাপে পড়লে তারা চুপ হয়ে যেতে পারে কিংবা অতিরিক্ত আবেগী হয়ে ওঠে। তাই শিশু যদি হতাশ, নিরুত্তাপ বা অতিমাত্রায় চঞ্চল আচরণ করে, তাহলে অভিভাবকদের উচিত হবে সহানুভূতির সাথে শিশুর অনুভূতির কথা শুনে বুঝে নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে কাউন্সেলরের সাহায্য নেওয়া।

১১ থেকে ১৩ বছর বা প্রাক-কিশোর বয়সে শিশুদের আচরণে শুরু হয় নাটকীয় পরিবর্তন। তারা কখনো নিজের স্বাধীনতা দাবি করে, আবার কখনো একাকীত্বে ভোগে। মানসিক চাপ, বন্ধুদের প্রভাব এবং শরীরী পরিবর্তন—এই বয়সের শিশুদেরকে এক অস্থির পর্যায়ে ঠেলে দেয়। তাদের আচরণে রূঢ়তা, প্রতিবাদ কিংবা আত্মবিশ্বাসের সংকট দেখা দিতে পারে। এই সময়টাতে তাদের ভালো বন্ধু ও বিশ্বাসভাজন হওয়াটাই অভিভাবকের প্রধান ভূমিকা হওয়া উচিত।

প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারে বর্তমান প্রজন্মের শিশুরা অনেক আগেই সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। সামাজিক মাধ্যম, ভিডিও গেম বা স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার তাদের বাস্তব সংযোগকে দুর্বল করে তুলছে। তাই অভিভাবকদের দায়িত্ব শুধু শিশুদের নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং তাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা—যাতে তারা নিজের অনুভূতি, ভয় বা আনন্দ বিনা দ্বিধায় ভাগ করে নিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের আচরণ একদিনে তৈরি বা পাল্টানো যায় না। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী ধৈর্য, বোঝাপড়া, সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভালোবাসার স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। বয়সভেদে শিশুর আচরণ পরিবর্তন হতেই পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে প্রতিটি সমস্যা শাস্তি দিয়ে সমাধান করতে হবে। বরং সময় দিলে, কথা বললে, অনুভূতির মূল্য দিলে শিশুরা নিজেরাই ঠিক রাস্তা খুঁজে নিতে শেখে।

একজন শিশু একেক বয়সে একেকভাবে বেড়ে ওঠে, প্রতিদিন তার মধ্যে নতুন কিছু তৈরি হয়। এই প্রতিটি পর্যায়েই প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা, সহানুভূতি ও গ্রহণযোগ্যতা। মনে রাখতে হবে—একজন শিশুর আচরণ আমাদের প্রতিফলনও হতে পারে। তাই অভিভাবকত্ব শুধুই নির্দেশনা নয়, এটি একটি অংশগ্রহণমূলক জীবনচর্চা।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত