ভুয়া টিকিটে সৌদিতে আটকা ২২ ওমরাহযাত্রী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৩ বার
ভুয়া টিকিটে সৌদিতে আটকা ২২ ওমরাহযাত্রী

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ধর্মীয় আবেগ ও আধ্যাত্মিক স্বপ্ন পূরণের আশায় পবিত্র ওমরাহ পালনে সৌদি আরব গিয়েছিলেন ২২ জন বাংলাদেশি। কিন্তু সেই পবিত্র যাত্রা এখন তাদের জন্য পরিণত হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের অভিজ্ঞতায়। ভুয়া রিটার্ন বিমান টিকিটের ফাঁদে পড়ে তারা এখন সৌদি আরবের জেদ্দায় আটকা পড়েছেন, যেখানে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় অবৈধ অবস্থায় দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের।

ভুক্তভোগী যাত্রীদের অভিযোগ, একটি হজ ও ওমরাহ এজেন্সির প্রতারণার কারণে তারা এই সংকটে পড়েছেন। ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ মার্চ “মাস্ক হজ গ্রুপ” নামের একটি এজেন্সির মাধ্যমে তারা ওমরাহ পালনের উদ্দেশে সৌদি আরবে যান। যাত্রার সময় এজেন্সির ব্যবস্থাপনা পরিচালক খলিলুর রহমান তাদের ৫ এপ্রিলের ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের রিটার্ন টিকিট সরবরাহ করেন। কিন্তু সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর তারা জানতে পারেন, ওই টিকিটগুলো আসলে ভুয়া।

অনলাইনে টিকিট যাচাই করতে গিয়ে তারা দেখেন, নির্ধারিত ফ্লাইটে তাদের নামে কোনো আসন সংরক্ষিত নেই। অর্থাৎ, দেশে ফেরার কোনো বৈধ ব্যবস্থা না রেখেই তাদের সৌদি পাঠানো হয়েছিল। বিষয়টি বুঝতে পেরে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং দ্রুত বাংলাদেশ হজ অফিস, জেদ্দায় যোগাযোগ করেন।

পরবর্তীতে ভুক্তভোগীরা জেদ্দায় বাংলাদেশ হজ অফিসের কাউন্সিলরের কাছে লিখিতভাবে সাহায্য প্রার্থনা করেন। ১৯ এপ্রিল কাউন্সিলর (হজ) কামরুল ইসলাম বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে ধর্ম সচিবের কাছে একটি চিঠি পাঠান, যাতে দ্রুত তাদের দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।

এদিকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন জানা যায়, ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এই ২২ জন ওমরাহযাত্রী বর্তমানে সৌদি আরবে অবৈধ অবস্থানে রয়েছেন। এতে তাদের নিরাপত্তা ও আইনি ঝুঁকি আরও বেড়ে গেছে। পরিবারের সদস্যরাও চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।

এ ঘটনায় ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন (কায়কোবাদ) জানিয়েছেন, অভিযুক্ত এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং তাদের দ্রুত দেশে ফেরানোর বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এই প্রতারণার পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরকারি সূত্র জানায়, “মাস্ক হজ গ্রুপ” নামের এই ট্রাভেল এজেন্সিটি অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব)-এর সদস্য হলেও এটি ধর্ম মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধিত হজ ও ওমরাহ এজেন্সি নয়। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো এজেন্সি ওমরাহ যাত্রী পাঠাতে চাইলে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সাল থেকে নিবন্ধন ছাড়াই ওমরাহ প্যাকেজ বিক্রি করে আসছে।

এর আগেও এই একই এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরবে যাওয়া ৭৪ জন ওমরাহযাত্রী একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাদেরও ভুয়া বা সমস্যাযুক্ত টিকিটের কারণে অতিরিক্ত খরচ করে দেশে ফিরতে হয়েছিল। তবে এবারের ঘটনায় ২২ জন যাত্রীর মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা থাকার কারণে বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে এবং প্রশাসনিক চাপ তৈরি হয়েছে।

এই ঘটনায় এজেন্সির মালিক খলিলুর রহমান নিজেও একাধিক পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। তিনি পল্টন থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন, যেখানে টিকিট সরবরাহকারী দুইটি ট্রাভেল এজেন্সি এবং তাদের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়ী করা হয়েছে। তার দাবি, তিনি পুরো অর্থ পরিশোধ করে টিকিট সংগ্রহ করেছিলেন, কিন্তু সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোর প্রতারণা ও গাফিলতির কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

ভুক্তভোগী ওমরাহযাত্রী আবু ইউসুফ বলেন, তাদের জীবনের সবচেয়ে পবিত্র যাত্রা এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। তিনি জানান, এজেন্সির অবহেলা ও প্রতারণার কারণে তারা মারাত্মক মানসিক ও আর্থিক সংকটে পড়েছেন। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তারা এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন এবং দ্রুত দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন।

এদিকে এজেন্সির মালিক খলিলুর রহমান দাবি করেছেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে হজ ও ওমরাহ লাইসেন্সের জন্য আবেদন করলেও তা পাননি। তিনি বলেন, সরকারি অনুমোদন না পাওয়ার কারণে আনুষ্ঠানিকভাবে লাইসেন্স ছাড়াই কার্যক্রম চালাতে বাধ্য হয়েছেন বলে তার দাবি। তবে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, নিবন্ধন ছাড়া এ ধরনের কার্যক্রম সম্পূর্ণ অবৈধ।

সৌদি আরবের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ওমরাহ পালনের জন্য যাত্রীদের অবশ্যই রিটার্ন টিকিট থাকতে হয়। কোনো যাত্রীকে বোর্ডিং পাস দেওয়া হয় না যদি তার ফেরার নিশ্চিত টিকিট না থাকে। পাশাপাশি ভিসা প্রক্রিয়ায় নুসুক প্ল্যাটফর্মে হোটেল বুকিং, পরিবহন ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য বীমা নিশ্চিত করতে হয়। সাধারণত এসবই এজেন্সির প্যাকেজের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সেই নিয়ম ভেঙে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে।

এই ঘটনা শুধু একটি এজেন্সির গাফিলতি নয়, বরং দেশের হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিবন্ধনবিহীন এজেন্সির কার্যক্রম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ না করা হলে ভবিষ্যতে আরও অনেক যাত্রী এমন প্রতারণার শিকার হতে পারেন।

সব মিলিয়ে, ধর্মীয় আবেগ নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই ২২ ওমরাহযাত্রীর অভিজ্ঞতা এখন এক গভীর সংকটের গল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের দেশে ফেরার অপেক্ষা যেমন দীর্ঘ হচ্ছে, তেমনি প্রশ্ন উঠছে—ধর্মীয় ভ্রমণের মতো সংবেদনশীল খাতে এমন প্রতারণা কীভাবে বারবার ঘটছে এবং এর দায় কে নেবে। এখন সবার নজর প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপের দিকে, যাতে এই যাত্রীরা নিরাপদে দেশে ফিরতে পারেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত