বার্ন ইউনিটে মৃত্যুর মিছিল: পুড়ে যাওয়া কুঁড়ির কান্নায় ভারী রাজধানীর আকাশ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২২ জুলাই, ২০২৫
  • ৯৫ বার
বার্ন ইউনিটে মৃত্যুর মিছিল: পুড়ে যাওয়া কুঁড়ির কান্নায় ভারী রাজধানীর আকাশ

প্রকাশ: ২২শে জুলাই, ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক  ।  একটি বাংলাদেশ অনলাইন

রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট যেন আজ কেবল চিকিৎসার জায়গা নয়, পরিণত হয়েছে কান্না, শোক আর বেঁচে থাকার নিঃসঙ্গ লড়াইয়ের মঞ্চে। কয়েক ডজন শিশুর পোড়া দেহ, ব্যান্ডেজে মোড়া নিথর মুখ আর আতঙ্কিত স্বজনদের চোখের পানি—সবকিছু মিলিয়ে বার্ন ইউনিটের প্রতিটি করিডোরে যেন জমে আছে অসহনীয় বেদনার এক প্রতিচ্ছবি।

মাত্র ৮ থেকে ১৩ বছরের শিশুরা আগুনে দগ্ধ হয়ে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পৌঁছে গেছে। কেউ ফিরে যেতে পারেনি, কেউ লড়ছে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। মঙ্গলবার দুপুর দেড়টা পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেছে ১০ জন, আর ভর্তি রয়েছে ৪৮ জন। এর মধ্যে ২৩ জনের অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক, ৫ জনকে রাখা হয়েছে আইসিইউতে। তাদের মধ্যেও তিনজন রয়েছেন লাইফ সাপোর্টে। চিকিৎসক, নার্স, স্টাফরা নিরলস চেষ্টা করেও অনেক সময় থেমে যাচ্ছেন মৃত্যুর দেয়ালে এসে।

হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, এক অসম্ভব আবেগময় দৃশ্য। স্বজনরা ছুটে বেড়াচ্ছেন বারান্দা থেকে আইসিইউ পর্যন্ত। কারো হাতে শিশুদের রক্তমাখা টিফিন বক্স, কেউ কোলে করে ধরে রেখেছেন ব্যান্ডেজে মোড়া নিথর দেহ। কাঁচের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে স্বজনরা ভেতরে চোখ রাখছেন, একটু খোঁজ পাওয়ার আশায়। কান্নায় ভারী হয়ে উঠছে পরিবেশ, কেউ চিৎকার করছেন, কেউ বসে পড়ছেন মেঝেতে মুখ ঢেকে। এ যেন এক যন্ত্রণার রূপকথা, যেখানে নায়ক-নায়িকারা কেবল শিশু।

দগ্ধদের তালিকায় আছে ৯-১৩ বছরের তানভীর, আফরান, ফায়াজ, শামীম, সায়ান ইউসুফ, এরিকশন, আরিয়ান ও নাজিম—তারা আর কখনো স্কুলে ফিরবে না। দুজন শিক্ষক মাহরিন চৌধুরী ও মাসুকাও এই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন। চিকিৎসকদের তথ্যে জানা যায়, দগ্ধদের মধ্যে অনেকে শতভাগ পোড়া শরীর নিয়ে ভর্তি, যাদের জীবন রক্ষা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

১৫ বছর বয়সী মাহতাব রহমান ভূঁইয়ার শরীরের ৭০ শতাংশ দগ্ধ। আইসিইউতে সে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। তার বাবা মিনহাজুর রহমান বলেন, “নিজে স্কুলে নিয়ে যেতাম ছেলেকে। এখন তাকে চিনতে পারি না। ছেলেকে যখন স্ট্রেচারে তোলা হচ্ছিল, আমি কিছু বুঝতে পারিনি।” এখন তার প্রার্থনা, শুধু একটি—“আমার ছেলে যেন সুস্থ হয়ে আমার বুকে ফিরে আসে।”

এদিকে নাজিয়া নামের ১০ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে সোমবার দিবাগত রাতে। তার ছোট ভাই রাফিও বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন। এমন দুই সহোদরের করুণ পরিণতি কাঁদিয়েছে গোটা হাসপাতাল চত্বরকে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইনফেকশন ঠেকাতে এবং চিকিৎসায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে স্বজনদের প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে। এ কারণে সকাল থেকে কড়াকড়ি আরোপ করা হয় প্রবেশে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নিরাপত্তা ছিল প্রবেশমুখে। পরিচয়পত্র ছাড়া কারো প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ।

জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. নাসির উদ্দিন জানান, পরিস্থিতি ভয়াবহ। সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে, মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে, বিশ্বমানের চিকিৎসা ও সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু দগ্ধদের অবস্থা এতটাই নাজুক যে, অনেককে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।

এই শিশুদের কেউ জানত না ‘মৃত্যু’ কী। তারা এসেছিল স্কুলে, বই-খাতা নিয়ে। কিন্তু কিছু মুহূর্তে জীবন তাদের মুখ ফিরিয়ে নিল। প্রশ্ন উঠছে—এই শিশুরা কি নিরাপদ ছিল তাদের স্বপ্নের জায়গায়? যে আগুন তাদের নিঃশব্দে নিঃশেষ করে দিল, তা কেবল ঘর পুড়ায়নি, পুড়িয়ে দিয়েছে পরিবার, পুড়িয়ে দিয়েছে ভবিষ্যৎ, প্রশ্নবিদ্ধ করেছে আমাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা।

এই মৃত্যুর মিছিল থামবে কবে? কবে নিশ্চিন্তে সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে পারবে কোনো বাবা-মা? কবে শিশুরা খেলবে, হাসবে, ফিরে আসবে জীবিত?

প্রশ্নগুলো জ্বলতে থাকে, যেমন জ্বলছে দগ্ধ শরীরগুলো…
এখনও হাসপাতালের প্রতিটি বেডে ঝরছে রক্ত, চোখের জল আর নিস্তব্ধ কান্না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত