প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পাঞ্জাবি পপ গানের জগতে উজ্জ্বল নাম Jasmine Sandlas। বলিউডে তাঁর কণ্ঠে গাওয়া ‘ইয়ার না মিলে’ গানটি মুক্তির পর রাতারাতি পরিচিতি পান তিনি, বিশেষ করে Kick ছবির মাধ্যমে। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে ছিল দীর্ঘ সংগ্রাম, মানসিক লড়াই আর কঠিন বাস্তবতার গল্প—যা অনেকটাই অজানা ছিল ভক্তদের কাছে।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের অন্ধকার সময়ের কথা খুলে বলেন জেসমিন। তিনি জানান, মাত্র ২৩ বছর বয়সে জীবনের নানা চাপ, একাকীত্ব এবং মানসিক ভাঙনের কারণে মদ্যপানের দিকে ঝুঁকে পড়েন। নিজের ভাষায়, প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি পান করতেন তিনি। সেই সময়টা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি, যেখানে সাফল্য থাকলেও ভেতরে ভেতরে তিনি ভেঙে পড়ছিলেন।
জেসমিনের জীবনের এই দিকটি অনেকটাই অজানা ছিল। বাইরে থেকে ঝলমলে ক্যারিয়ার আর জনপ্রিয়তার আড়ালে তিনি লড়ছিলেন নিজের সঙ্গে। ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন, পারিবারিক অশান্তি এবং সবচেয়ে বড় আঘাত—বাবার মৃত্যু—তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। সেই শূন্যতা পূরণ করতে গিয়ে তিনি মদ্যপানের আশ্রয় নেন। তবে সময়ের সঙ্গে তিনি উপলব্ধি করেন, এই পথ তাকে আরও একাকী করে তুলছে।
জেসমিনের জীবনের সংগ্রাম শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং শৈশব থেকেই তাকে লড়াই করতে হয়েছে প্রতিকূলতার সঙ্গে। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান তিনি। নতুন দেশে গিয়ে শুরু হয় নতুন সংগ্রাম। New York City-তে তাঁদের প্রথম জীবন ছিল অত্যন্ত কষ্টের। ছয়জনের একটি পরিবার একটি ছোট এক বেডরুমের ফ্ল্যাটে থাকতেন। সংসার চলত রেশন দোকানের খাবারে। ভাষাগত সমস্যার কারণে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়াও ছিল অত্যন্ত কঠিন।
তার বাবা, যিনি ভারতে প্রতিষ্ঠিত একজন পেশাজীবী ছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করতে বাধ্য হন। গ্যাস স্টেশনে কাজ করা থেকে শুরু করে নানা ছোটখাটো কাজে যুক্ত হয়ে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তিনি। অন্যদিকে তাঁর মা-ও শ্রমজীবী কাজ করে সংসার সামলাতেন। এই সংগ্রামী জীবনই জেসমিনকে শিখিয়েছে ধৈর্য, পরিশ্রম আর বাস্তবতার কঠিন পাঠ।
পরবর্তীতে পরিবারটি California-তে চলে গেলে কিছুটা স্বস্তি আসে। সেখানে তাঁর বাবা আদালতে দোভাষীর কাজ পান এবং ধীরে ধীরে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হতে থাকে। জীবনের এই পরিবর্তন জেসমিনের মধ্যেও নতুন আশা জাগায়, যা তাকে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।
সংগীতজীবনে প্রবেশের পর জেসমিন ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করতে শুরু করেন। পাঞ্জাবি সংগীতের জগতে তার স্বতন্ত্র কণ্ঠ ও স্টাইল তাকে আলাদা পরিচিতি দেয়। পরে বলিউডে সুযোগ পেয়ে আরও বড় পরিসরে নিজেকে তুলে ধরেন। তবে সাফল্যের মাঝেও তিনি নিজের ব্যক্তিগত লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
জেসমিন জানান, জীবনের সেই অন্ধকার সময় থেকে বেরিয়ে আসতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে তাঁর পরিবার, বিশেষ করে তাঁর মা। মায়ের সমর্থন এবং ভালোবাসা তাকে নতুন করে বাঁচার শক্তি দিয়েছে। তিনি বলেন, তাঁর সবচেয়ে বড় লড়াই ছিল নিজের সঙ্গে, আর সেই লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার পেছনে পরিবারের অবদান সবচেয়ে বেশি।
বর্তমানে জেসমিন নিজেকে বদলে নতুনভাবে জীবন শুরু করেছেন। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি এখন আরও সচেতন এবং আত্মবিশ্বাসী। তিনি বিশ্বাস করেন, পরিবার পাশে থাকলে যেকোনো কঠিন সময় পার হওয়া সম্ভব। তাঁর এই অভিজ্ঞতা অনেকের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে, বিশেষ করে যারা জীবনের কঠিন সময় পার করছেন।
সম্প্রতি ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’ ছবির একাধিক গানে কণ্ঠ দিয়ে আবারও আলোচনায় এসেছেন তিনি। ‘জাইয়ে সাজানা’, ‘আরি আরি’ এবং ‘মে অর তু’ গানগুলো ইতোমধ্যে শ্রোতাদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। নতুন এই সাফল্য যেন তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
জেসমিনের গল্প শুধু একজন সংগীতশিল্পীর সাফল্যের গল্প নয়, বরং এটি এক সংগ্রামী জীবনের প্রতিচ্ছবি। যেখানে রয়েছে কষ্ট, ব্যর্থতা, আত্মসংঘর্ষ এবং শেষ পর্যন্ত ফিরে আসার শক্তি। তাঁর জীবনের এই বাস্তব অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সাফল্যের পেছনে অনেক অজানা গল্প লুকিয়ে থাকে, যা বাইরে থেকে কখনো বোঝা যায় না।
সবশেষে বলা যায়, জেসমিন স্যান্ডলাসের জীবন এক অনন্য উদাহরণ, যেখানে কঠিন সময়কে জয় করে নতুনভাবে পথচলা সম্ভব হয়েছে। তাঁর এই যাত্রা অনেক তরুণ-তরুণীর জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে, যারা স্বপ্ন দেখতে চায় এবং সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে চায়।