অগ্নিপথে ঝরে গেল দুটো জীবন: মাইলস্টোন দুর্ঘটনায় ভাইয়ের পর বোনেরও করুণ মৃত্যু

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৩ জুলাই, ২০২৫
  • ৩০ বার
অগ্নিপথে ঝরে গেল দুটো জীবন: মাইলস্টোন দুর্ঘটনায় ভাইয়ের পর বোনেরও করুণ মৃত্যু

প্রকাশ: ২৩শে জুলাই, ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

রাজধানীর উত্তরায় অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় দেশে নেমে এসেছে শোকের ছায়া, আরেকটি পরিবারের স্বপ্ন-ভবিষ্যৎ সবকিছু ছারখার হয়ে গেছে অগ্নিকাণ্ডের বিভীষিকায়। দুর্ঘটনায় প্রথমে দগ্ধ হয়ে মৃত্যু ঘটে কিশোরী তাবাসসুম নাজিয়ার, আর তার ঠিক একদিন পর একই পরিণতির শিকার হলো তার ছোট ভাই, নয় বছরের শিশু আরিয়ান আশরাফ নাফি।

সোমবার দুপুরের ভয়াল সেই মুহূর্তে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি এফটি-৭ বিজিআই প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আছড়ে পড়ে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভবনের ভেতরে। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে স্কুল চত্বরে, ধোঁয়ায় ঢেকে যায় আকাশ। ওই সময় ভবনের ভেতরে ক্লাসে উপস্থিত ছিল দুই ভাইবোন – তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী তাবাসসুম নাজিয়া ও প্রথম শ্রেণির ছাত্র আরিয়ান আশরাফ নাফি। তাদের আর ফিরিয়ে আনা গেল না।

মঙ্গলবার ভোররাতে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে মারা যায় ১৩ বছরের নাজিয়া, যার শরীরের ৯০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। চিকিৎসকেরা জানালেন, তার অবস্থাও শুরু থেকেই ছিল সংকটাপন্ন। তারপর বুধবার রাত ১২টা ১৫ মিনিটে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে তার ছোট ভাই নাফি। আবাসিক চিকিৎসক ডা. শাওন বিন রহমান বলেন, “নাফির শরীরের ৯৫ শতাংশ দগ্ধ ছিল। এত বড় ফ্লেম বার্ন নিয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। শুরু থেকেই আমরা জানতাম সম্ভাবনা খুবই কম।”

শিশু দুটি ছিল তাদের বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। উত্তরা কামারপাড়ায় বাস করা পরিবারটি রাজধানীতে পাড়ি জমিয়েছিল সন্তানদের ভালোমানের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার প্রত্যাশায়। পিতা আশরাফুল ইসলাম একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন, তার সন্তানরা সুশিক্ষিত হয়ে দেশের জন্য কিছু করবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন চাপা পড়ে আছে দুটো কচি কবরের নিচে – কামারপাড়ার মাটিতে।

শিশুদের মামা মো. ইমদাদুল হক তালুকদার এক অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, “আমার বোন ও দুলাভাই ভেঙে পড়েছেন। কেউ কথা বলার অবস্থায় নেই। আমাদের আর কিছু বলার নেই। দোয়া করবেন।”

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৩০ ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সূত্র। আহত হয়েছেন বহু শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দা। অনেকেই এখনো চিকিৎসাধীন। দেশজুড়ে প্রশ্ন উঠেছে—স্কুল ভবনের এমন একটি এলাকায় কীভাবে একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হলো? কীভাবে এমন ভয়াবহ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার শিকার হলো নিরীহ শিক্ষার্থীরা? দায় কার?

এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, নিরাপত্তার বিষয়টি কখনোই অবহেলার জায়গা নয়—বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো স্পর্শকাতর স্থানে। দেশের শিক্ষা-পরিমণ্ডল আজ শোকে, ক্ষোভে ও অনিশ্চয়তায় স্তব্ধ। রাষ্ট্রের দায়িত্ব এখন শুধুই ক্ষতিপূরণ নয়, বরং ভবিষ্যতে যাতে কোনো নাজিয়া বা নাফির নাম এভাবে সংবাদ শিরোনামে না আসে, সে নিশ্চয়তাও দিতে হবে।

একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ যেন চোখের সামনেই পুড়ে ছাই হয়ে গেল। এই দুই শিশুর মৃত্যু শুধুই একটি পরিবারের জন্য ক্ষতি নয়, এটি একটি জাতির সম্ভাবনার অপমৃত্যু। আজ আমরা সবাই সেই নিস্পাপ মুখগুলোর কাছে দায়ী।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত