সম্পর্কে সম্মান না থাকলে সমাজে বিভেদ: ধ্বংসের মুখে নতুন প্রজন্ম

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই, ২০২৫
  • ১৪১ বার

প্রকাশ: ২৪ শে জুন, ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভাঙন যেমন বিয়ে কিংবা প্রেমে বিচ্ছেদ—তা সমাজের জন্য স্বাভাবিক একটি ঘটনা। কিন্তু এসব বিচ্ছেদের পেছনে যদি সম্মানের অভাব, অবজ্ঞা, ঘৃণা কিংবা অপমানজনিত আচরণ প্রধান ভূমিকা রাখে, তখন এর প্রভাব শুধু ব্যক্তি বা পরিবারেই সীমাবদ্ধ থাকে না—ছড়িয়ে পড়ে পুরো সমাজব্যবস্থায়। সম্মানহীন সম্পর্কের এই অপসংস্কৃতি আজকের প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তৈরি করছে বিষাক্ত সামাজিক দ্বন্দ্ব, যার পরিণতি ভয়াবহ।

বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, সম্পর্ক ভাঙার পরও পারস্পরিক অপমান, সামাজিক মাধ্যমে বিদ্বেষ ছড়ানো, ব্যক্তিগত বিষয়কে জনসম্মুখে টেনে আনা এবং মানহানিকর ভাষা ব্যবহার একটি ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই প্রবণতা ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। যেখানে একসময় সম্পর্কগুলো অন্তরঙ্গতা, সহমর্মিতা ও সম্মান দিয়ে পরিচালিত হতো, সেখানে এখন অহংকার, ইগো, প্রতিশোধ এবং মানহানির প্রবণতা গভীর শিকড় গেঁড়েছে।

সম্পর্কে সম্মানের অভাব আমাদের সমাজে কয়েকটি বড় সংকট তৈরি করছে। প্রথমত, এটি মানুষকে আস্থাহীন করে তোলে—তারা ভবিষ্যতে আর কারও প্রতি বিশ্বাস রাখতে চায় না। দ্বিতীয়ত, নতুন প্রজন্মের চোখে সম্পর্ক মানে হয়ে দাঁড়ায় ঝুঁকি ও কষ্টের উৎস। তারা ভালোবাসা কিংবা বিয়ের মতো সামাজিক বন্ধনকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। ফলে ধীরে ধীরে পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটি দুর্বল হয়ে পড়ে, যা সমাজের মূল ভিত্তিকেই নষ্ট করে দেয়।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, বিয়ে বা প্রেমে বিচ্ছেদ মানেই ব্যর্থতা নয়, বরং সঠিক বোঝাপড়ার অভাব কিংবা সময়ের প্রেক্ষাপটে আলাদা হয়ে যাওয়াও জীবনচক্রের অংশ। কিন্তু যদি সেই বিচ্ছেদের মধ্যেও সম্মান বজায় না থাকে, তাহলে তা অন্যদের মনে ক্ষোভ, অবিশ্বাস ও ভয় সঞ্চার করে। শিশু ও কিশোর বয়সী যারা এসব সম্পর্কের ছিন্নভিন্ন রূপ দেখছে পরিবার বা আশেপাশে—তারা বেড়ে উঠছে মানসিক অবসাদ, হতাশা ও রাগ নিয়ে।

একইসঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ার বিপজ্জনক ভূমিকা এ ক্ষেত্রে অস্বীকার করা যায় না। বিচ্ছেদের পর সামাজিক মাধ্যমে একে অপরকে অপমান করা, ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ, ব্যক্তিগত কথোপকথন ফাঁস করা কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভিডিও তৈরি—এসবই তরুণদের মধ্যে প্রতিশোধ ও অশ্রদ্ধার মানসিকতা তৈরি করছে। এটি শুধু ব্যক্তির সুনাম নষ্ট করছে না, নতুন সম্পর্কেও ভয় ঢুকিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে প্রজন্মের মধ্যে তৈরি হচ্ছে সম্পর্ক থেকে দূরে থাকার প্রবণতা, যা ভবিষ্যতে পরিবার, সমাজ ও মূল্যবোধের কাঠামোকে ভেঙে দিতে পারে।

সমাধান একটাই—সম্পর্ক যতই জটিল বা ব্যর্থ হোক, পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা। সম্পর্ক ভাঙলে রাগ, কষ্ট বা আবেগ থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু সেই আবেগ যদি ঘৃণায় রূপ নেয়, তাহলে তা কেবল অন্যজনকে নয়, নিজের আত্মাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরও সম্মান রেখে বিদায় নিতে পারাটা একটি সুস্থ মনের পরিচায়ক, যা ভবিষ্যতে আরও ভালো সম্পর্ক তৈরির শক্তি দেয়।

আজকের সমাজে সবচেয়ে জরুরি একটি বার্তা হলো—সম্পর্কের ভিত্তি ভালোবাসা না হলেও, তার প্রস্থানে সম্মান থাকা চাই। সম্পর্কের এই সম্মানবোধই নতুন প্রজন্মকে একটি মানবিক, সহানুভূতিশীল ও নৈতিক সমাজের দিকে নিয়ে যেতে পারে। অন্যথায়, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে উঠবে সন্দেহ, বিষাদ ও অস্থিরতার পরিবেশে, যেখানে সম্পর্ক আর বিশ্বাস—দুটোই বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

সুতরাং, আজ আমাদের দরকার একটি সম্মাননির্ভর সাংস্কৃতিক বিপ্লব, যেখানে ভিন্নমত থাকবে, বিচ্ছেদও থাকবে, কিন্তু থাকবে মানবিকতা, পরিণত মন এবং সহনশীলতা—যা একটি সভ্য সমাজ ও প্রজন্মকে টিকিয়ে রাখতে অপরিহার্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত