প্রকাশ: ২৫ জুলাই’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
দীর্ঘ সময় ধরে প্রভাব বিস্তারকারী স্বৈরাচারী সরকারের পতনে ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ হিসেবে পরিচিত ঐতিহাসিক গণ-আন্দোলনের স্মৃতি এখনো অমলিন। সেই অভ্যুত্থানের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন একদল তরুণ শিক্ষার্থী, যাদের রাজনৈতিক পরিচয় ছিল প্রথাগত গণ্ডির বাইরে। তাদের ডাকে দেশের নানা প্রান্ত থেকে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে, বুক চিতিয়ে বুলেটের মুখোমুখি হয়, এবং শেষ পর্যন্ত বিদায় নেয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন সরকার।
এই মহান আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ছাত্র প্ল্যাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে গড়ে উঠেছিল একটি ৬৫ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি, পরে যেটি ১৫৮ সদস্যে রূপান্তরিত হয়। নাহিদ ইসলাম ছিলেন প্রধান সমন্বয়ক। সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ, মো. মাহিন সরকার, আব্দুল কাদের এবং হান্নান মাসউদের মতো তরুণদের দৃঢ় নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন একসময় জনসমুদ্রে রূপ নেয়। আন্দোলনে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন দিয়েছিল বিএনপি, জামায়াত, ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরসহ সব ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি। এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়।
এই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জন্ম হয় একটি নতুন রাজনৈতিক পরিসরের, যেখানে নেতৃত্বের ভূমিকা নিতে শুরু করেন আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়কারীরা। অনেকেই যোগ দেন নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি)-তে। তবে অভ্যুত্থানের মূল কৃতিত্ব নিয়ে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে যে টানাপড়েন এবং দাবিদাওয়া শুরু হয়েছে, তা নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন এই আন্দোলনের শীর্ষ নেতারা।
এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) ও অভ্যুত্থানের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেন, “এই আন্দোলন একক কারো ছিল না। আমরা দেখছি, এখন কেউ কেউ কৃতিত্ব নিয়ে ‘পজিশনিং’-এর খেলায় মেতে উঠেছেন। এটা অপ্রত্যাশিত, অনৈতিক। যারা রাস্তায় ছিল, যারা শহীদ হয়েছেন, যারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, সবাইকেই সম্মান জানাতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “কোনো অংশগ্রহণকারী যদি এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে না থাকতেন, হয়তো আমাদের বিজয় পিছিয়ে যেত, কিংবা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারতো। তাই এই সংগ্রামের কৃতিত্ব সমগ্র জাতির।”
নাহিদ ইসলাম, যিনি এনসিপির আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন, অভ্যুত্থানের প্রেরণাকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার না করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আন্দোলনের মূল শক্তি ছিল সাধারণ মানুষ। ছাত্র-জনতার ঐক্য ছিল চূড়ান্ত রূপ। এই চেতনা যারা ধারণ করবে, তারাই ভবিষ্যতে মানুষের আস্থা পাবে।”
নাহিদ বলেন, “ফ্যাসিবাদবিরোধী দলগুলো নিজেরাই যখন স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক নীতিতে ব্যর্থ, তখন নতুন যুগের দাবি পূরণ করতেই এনসিপির জন্ম হয়েছে। আমরা বৈষম্যহীন একটি বাংলাদেশ চাই।”
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর সাব্বির আহমেদ মনে করেন, “এই অভ্যুত্থানে কোনো একক গোষ্ঠীর দাবি না থাকলেও, ছাত্রদের অসীম সাহসিকতা এবং ত্যাগ ছিল অনস্বীকার্য। তারা ইতিহাস তৈরি করেছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রামে থাকা ফ্যাসিবাদবিরোধী দলগুলোকেও এ ইতিহাস থেকে বাদ দেওয়া যাবে না।”
তার মতে, “বিজয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বিজয়ের নৈতিক ব্যবহার। সত্যিকারের ফ্যাসিবাদমুক্ত, ইনসাফভিত্তিক একটি রাষ্ট্র গঠনে এই অভ্যুত্থান যেন অপচয়ে না যায়—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।”
সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া সেই আন্দোলনের ঢেউ এখনো স্পন্দিত হচ্ছে রাজপথে, মিডিয়ায় ও জনমানসে। কৃতিত্বের লড়াই নয়, বরং স্বপ্নের বাস্তবায়নই হোক নতুন বাংলাদেশ গড়ার মূলমন্ত্র—এমনটাই প্রত্যাশা গণমানুষের।