হারিয়ে যাওয়া শৈশব: স্মৃতির আয়নায় সোনালি দিনগুলো

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৯ জুলাই, ২০২৫
  • ৬৮ বার

প্রকাশ: ২৯ জুলাই, ২০২৫ । নিজস্ব প্রতিবেদক।একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ইসমাত আরা জাহান

যান্ত্রিক নগরজীবনের কোলাহল, প্রযুক্তির নেশা আর সময়ের অস্থিরতা আমাদের ছুটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এক অজানা ভবিষ্যতের দিকে। কিন্তু এর মাঝেই কখনো কখনো হঠাৎ থেমে গিয়ে মনে পড়ে — সেই হারিয়ে যাওয়া ছোট্ট বেলার কথা। সেই শৈশব, যা এখন শুধুই মনের কোণে জমে থাকা ধূলিধূসর স্মৃতি, একেকটা মুহূর্ত যেন একেকটি ছবির মতো ভেসে ওঠে মনেপ্রাণে — সরলতা, হাসি আর মাটির গন্ধে ভরা এক জীবন্ত অধ্যায়।

পুকুরের জলে ডুবসাঁতার কাটা ছিল যেন প্রতিদিনের অনুশীলন। সূর্য মাথায় উঠলে শুরু হতো অভিরত সাঁতার প্রতিযোগিতা — কে আগে পারে পাড়ে পৌঁছাতে, কে বেশি সময় থাকতে পারে পানির নিচে। কোনো আনুষ্ঠানিক কোচিং নয়, প্রাকৃতিক খেলার মাঠেই শিখে নেওয়া হতো জীবনের ব্যালান্স।

গ্রামের উঠোনজুড়ে চলত গুল্লাছুট, কানামাছি বা বলিবলের উন্মাদনা। একটানা ছুটে চলা, মাটিতে গড়াগড়ি, হাসির খুনসুটি — প্রতিটা খেলাই ছিল বন্ধন তৈরি করার এক অমলিন মাধ্যম। হাতের মুঠোয় মোবাইল নয়, বরং ধুলো-মাখা গুলি ছিল আমাদের আনন্দের খনি। ঘরের পাশে কলাপাতার আড়ালে চলত ‘বর-কনের হাঁড়ি পাতিল খেলা’। মাটির তৈরি পুতুল আর কলাপাতার বাসনে রাঁধাবাড়ি চলত এমন এক নিষ্পাপ আন্তরিকতায়, যেন সেখানেই ছোট্ট এক সংসার।

দিনের আলো ফুরোলে রাতে অপেক্ষা করত আরেক পৃথিবী। দাদিমার মুখে শোনা যেত রূপকথার গল্প — রাক্ষস, পরী, রাজপুত্র, সাধুবাবা। কাঁথা গায়ে দিয়ে পাখার বাতাসে সেই গল্পগুলো ছিল বাস্তবের চেয়েও জীবন্ত। নরম আলো, দাদির কণ্ঠ, আর আকাশভরা তারা — সব মিলিয়ে রাত্রির নীরবতা যেন হয়ে উঠত এক অতুলনীয় অভিজ্ঞতা।

বৃষ্টির দিনে জলকাদা মেখে খেলার মজা ছিল আলাদা। কারো কোনো বাধা ছিল না — কাদা মাখা জামা, ভিজে শরীর নিয়েই চলত মাঠ দাপানো। মাটির গন্ধ, বৃষ্টিতে সিক্ত গাছপালা আর ছেলেবেলার গাঢ় হাসি মিলে তখনকার বৃষ্টি হয়ে উঠত আনন্দের উৎসব। আর বাড়ির পাশে উঠোনে সিমের বিস পুড়িয়ে খাওয়া — যেন ছিল এক নিজস্ব উৎসব, যার স্বাদ এখনো জিভে লেগে থাকে।

এই শৈশব ছিল প্রযুক্তির আগ্রাসনহীন, কৃত্রিমতার বাইরে এক মানবিক সময়ে গড়া। আমরা তখন সময়ের পেছনে ছুটতাম না, বরং সময়ই আমাদের সাথে দৌড়াতো। খেলায় ছিল প্রাণ, গল্পে ছিল শিক্ষা, আর সম্পর্কগুলো ছিল হৃদয়ের গাঁথুনিতে গড়া।

আজকের প্রজন্মের কাছে এসব অভিজ্ঞতা অনেকটাই কল্পকাহিনির মতো। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, ভার্চুয়াল জগত তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও, তাদের চোখে কোনোদিন ফুটবে না সেই পুকুরের জল ছুঁয়ে বয়ে যাওয়া নিরবধি আনন্দ, কিংবা দাদির গল্পে রাতভর চোখে ঘুম না আসার সেই সোনালি রাত।

তবুও আশাবাদী হওয়া যায় — যদি আমরা শৈশবের এই বর্ণময় স্মৃতিগুলো তুলে ধরি নতুন প্রজন্মের সামনে, যদি আমরা তাদের নিয়ে যাই কোনো এক গ্রামের উঠোনে, পুকুরপাড়ে কিংবা গল্প শোনার রাতে, তবে হয়তো আবার একদিন জেগে উঠবে সেই সরলতা। হারিয়ে যাওয়া ছোট্ট বেলাটা আবার ফিরে আসবে কোনো শিশুর পায়ে লেগে থাকা কাদার মতো, যার ঘ্রাণে ভরে যাবে পুরো একটা হৃদয়।
সময় যেন কাঁধে ব্যাগ নিয়ে দূরে দূরে হাঁটে, আর আমরা দাঁড়িয়ে থাকি সেই পুরনো উঠোনে—যেখানে এখনও শিশির ভেজা কচুপাতায় ভোর নামে, যেখানে আজও কানে ভাসে পুকুরের জল ছাপিয়ে ছুটে আসা সাঁতারের ছপছপ শব্দ। হারিয়ে যাওয়া ছোট্টবেলার স্মৃতিগুলো তাই মাঝেমধ্যে জীবনের পেছনের দরজা খুলে দেয়, যেন সময়কে উল্টো করে ফেরানো যায়।

পুকুর ছিল আমাদের সমুদ্র, আর তার জলে অভিরত সাঁতার ছিল যেন জীবনের প্রথম জয়। কত দুপুর যে কেটেছে বন্ধুদের সঙ্গে ঘরবাড়ি ভুলে জলকেলিতে, তার হিসাব নেই। খেলাধুলার ব্যাকরণ ছিল না, কিন্তু ছিল আনন্দের অফুরান ধারা। মাঠের মধ্যে চলত বলিবল, তার ফাঁকে গুল্লাছুট, কানামাছি—ততক্ষণ চলত, যতক্ষণ না সন্ধ্যার আলো ঢেকে দিত আমাদের পৃথিবী।

বেলা শেষে কলাপাতা খুলে চলত বর-কনের হাঁড়ি-পাতিল খেলা। মাটির পুতুল আর রান্নাবাটির খেলায় যেন গড়ে উঠত আমাদের ছোট্ট সংসার। কত সহজ, কত মমতাময় ছিল সে জীবন—যেখানে স্বপ্ন মানে ছিল হাতের নাগালে কিছু, আর খুশি ছিল মাটিতে মাখামাখি করা একটা দুপুর।

বৃষ্টির দিনে ভিজে যাওয়া মাটির গন্ধ ছিল এক অভাবনীয় সুখ। খালি পায়ে দৌড়ে গেছি কাদায় । মাটির চুলায় পুড়ে যাওয়া সেই বিসই ছিল তখন রাজকীয় আহার। শহরের চকচকে খাবারে সে স্বাদ কখনোই পাওয়া যায় না।

ভোর হলে মক্তবে যেতাম পাতদান হাতে। শিশিরে ভেজা ঘাসের ফাঁকে সাদা কচুপাতায় সূর্যের আলো পড়ত, আর মনে হতো, এ যেন কোনো পরীর পৃথিবী। দুপুরে আগুনে তাওয়া তুলে ভাজা হতো মুড়ি, ডাল বা গরুর চর্বি; মাটির পিঁড়িতে বসে চলত খাওয়ার আনন্দ। মাটির স্বাদ আমরা তখন জানতাম—সে স্বাদ ছিল নিখাদ, খাঁটি।

মায়ের বকুনি, কখনো এক চড়, কখনো কান মলা—এসবও ছিল আমাদের জীবনের নিত্য সঙ্গী। কিন্তু সে শাসনের মাঝেই ছিল এক গভীর মায়া, এক নির্ভেজাল ভালোবাসা। ছোট ভুলে মায়ের ধমক, আবার মাটিতে পড়ে গেলে সেই মায়ের কোলে মাথা রাখাই ছিল সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।

আজ সব কিছুই আছে—বাড়ি, শহর, রাস্তা, মানুষ। নেই শুধু সেই সরলতা, সেই মন। প্রযুক্তি আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে দুনিয়া, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে সেই নিঃশব্দ দুপুর, শিশির ভেজা ভোর, আর মাটির সাদ।

তবুও স্মৃতির পাতায় সেই ছোটবেলা আজও জীবন্ত। কোনো ছবি নয়, কোনো ভিডিও নয়—আমাদের মনে গাঁথা গল্পগুলোই হলো সত্যিকারের আর্কাইভ। সেসব ফিরে পাওয়ার নয়, কিন্তু সেসব ভুলে যাওয়ারও নয়।

শুধু মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় পুরনো উঠোনে, শোনার জন্য সেই পুকুর ডাক—যেটা আজও ভেসে আসে কোনো এক নির্জন দুপুরে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত