দিনদুপুরে সিন্ডিকেট-চালিত ছিনতাই: দায় কার, মুক্তির পথ কোথায়?

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩০ জুলাই, ২০২৫
  • ৪৬ বার

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে দিনদুপুরে ছিনতাই এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এ যেন এক নিয়মিত আতঙ্ক, যা নাগরিক জীবনের স্বাভাবিক ছন্দকেই অস্থির করে তুলছে। কখনো মোটরসাইকেল, কখনো রিকশা, কখনো বা হেঁটে চলা পথচারী, সবারই নিশানা হতে হচ্ছে সুসংগঠিত ছিনতাইকারীদের হাতে। আশ্চর্যের বিষয়, এসব ঘটনার বেশিরভাগই ঘটছে জনবহুল এলাকা, এমনকি পুলিশ টহলের মাঝেও।

ছিনতাইয়ের এই লাগামহীন বিস্তারে প্রশ্ন উঠেছে—নাগরিক নিরাপত্তার দায় কার? সরকার, পুলিশ না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোয়েন্দা ব্যর্থতা? আর এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা কতটা প্রস্তুত?

অপরাধচক্রের ধরন এবং সময়ের প্যাটার্ন
বিশ্লেষকদের মতে, ছিনতাই এখন আর দু’একজন দুষ্কৃতিকারীর তাৎক্ষণিক লোভ নয়—এটি একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ কাঠামো, যার পেছনে রয়েছে সংঘবদ্ধ চক্র, পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রযুক্তির কৌশলী ব্যবহার। রাজধানীর বিভিন্ন থানায় জমা পড়া অভিযোগ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অধিকাংশ ছিনতাই সংঘটিত হয় সকাল ৭টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে এবং রাত ৮টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত। অপরাধীরা কখনো পুলিশ পরিচয়ে, কখনো কুরিয়ার সার্ভিস বা মোটরসাইকেল রাইডার ছদ্মবেশে কাজ করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা শারীরিক আক্রমণ করে মোবাইল ফোন, ব্যাগ, ল্যাপটপ বা নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয়। সিলেটের ব্যস্ত নগরী জিন্দাবাজারে বন্দরে ঘটে প্রতিনিয়ত এরকম তবে অতীতের তুলনায় তা এখন রেকোর্ট ছেড়ে যাচ্ছে এরকমই বলছিলেন আমাদের, ব্যবসায়ে জড়িত ব্যক্তি বর্গ ও দোকানীরা ,পথচারীবৃন্দ , এছাড়া মৌলভীবাজারের খুলাউড়া থেকে বলছিলেন আরেকজন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অপরাধচক্রের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কিছু সাবেক অপরাধী, স্থানীয় প্রভাবশালী, এমনকি কখনো কখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ছত্রচ্ছায়াও। পুলিশের নিরবতা বা প্রতিক্রিয়ার ধীরগতিও অপরাধীদের উৎসাহিত করছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার ও অপরাধ বিশ্লেষক মাহবুব তালুকদার বলেন, “সাম্প্রতিক ছিনতাইয়ের ধরন স্পষ্টতই পরিকল্পিত। বিষয়টি শুধু পুলিশি টহলে সমাধানযোগ্য নয়, গোয়েন্দা নজরদারি, অপরাধ বিশ্লেষণ ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “অপরাধ প্রবণ এলাকাগুলোতে হটস্পট ভিত্তিক কন্টিনজেন্সি প্ল্যান থাকা উচিত, যেখানে শুধু পুলিশ নয়—র‍্যাব, ডিজিটাল নজরদারি ও স্থানীয় প্রশাসন একত্রে কাজ করবে।”

পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক তথ্য বিবরণীতে বলা হয়েছে, “২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ঢাকা মহানগরে ছিনতাই ও পথ অপরাধ সম্পর্কিত প্রায় ২,৭০০ মামলা রুজু হয়েছে, যার মধ্যে ১,৪০০টি মামলার তদন্ত এখনো চলমান। অভিযুক্তদের অনেকেই পুরনো অপরাধী, যাদের বিরুদ্ধে আগে একাধিক মামলা থাকলেও জামিন পেয়ে পুনরায় সক্রিয় হয়েছে।”

আইনি কাঠামো ও বিচারপ্রক্রিয়ার দুর্বলতা
ছিনতাই রোধে আইনি কাঠামো রয়েছে, তবে এর প্রয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৯২, ৩৯৪ ও ৩৯৫ ধারায় ছিনতাই এবং ডাকাতির অপরাধের কঠোর শাস্তি নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে দেখা যায়, মামলার দীর্ঘসূত্রতা এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের দুর্বলতায় অধিকাংশ অপরাধী শাস্তি এড়ায়।

এ বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার আফরোজা খানম বলেন, “ছিনতাইয়ের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া অনেকেই সুনির্দিষ্ট চার্জশিট না থাকায় জামিনে বেরিয়ে আসছে। এর ফলে তারা আবারও অপরাধে জড়াচ্ছে। বিচারিক প্রক্রিয়ায় দ্রুততা ও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ব্যবস্থার ঘাটতি এই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।”

নাগরিকদের মানসিক অবস্থা ও নিরাপত্তাহীনতা
সাম্প্রতিক সময়ে মোবাইল ফোন হারানোর পাশাপাশি আহত হওয়া, এমনকি হত্যাকাণ্ডেরও খবর পাওয়া গেছে। এতে করে সাধারণ মানুষজন দিনভর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ভুগছে। বিশেষ করে নারীরা ও বয়স্করা বেশি আতঙ্কিত। অনেকে প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে বের হচ্ছেন না, যা নগর জীবনে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক অবরোধ তৈরি করছে।

কার দায় কতটুকু?
বিশ্লেষকদের মতে, ছিনতাই বা সড়ক অপরাধের দায় একক কোনো পক্ষের নয়। এটি সমষ্টিগত ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে সেই দায়িত্ব শুধু পুলিশ বা প্রশাসনের ওপর চাপিয়ে দিলেই সমাধান হবে না।

সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. রকিবুল হায়দার বলেন, “আইনের শাসন দুর্বল হলে সমাজে অপরাধের প্রবণতা বাড়ে। শুধু শাস্তি নয়, অপরাধীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও থাকতে হবে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা অপরিহার্য।”

সমাধানের পথ কোথায়?
১. ছিনতাই হটস্পটগুলোতে সিসিটিভি ও মোবাইল পেট্রল ইউনিটের সংখ্যা বাড়ানো
২. স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক স্বেচ্ছাসেবক বা কমিউনিটি ওয়াচ গ্রুপ গঠন
৩. দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের আওতায় ছিনতাই মামলাগুলোর নিষ্পত্তি
৪. রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় থাকা অপরাধীদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত
৫. সামাজিক সচেতনতা এবং আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ

দিনদুপুরে ছিনতাইয়ের ভয়াল বাস্তবতা এখন আর কল্পনার বিষয় নয়। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে সমাজে অনাস্থা, আতঙ্ক ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি বাড়বে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনসম্পৃক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া এই অপরাধ প্রবণতা বন্ধ হবে না। নাগরিকের প্রশ্ন এখন—নিরাপত্তার দায় নেবে কে? এবং সেই উত্তর রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাছেই আজ সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশিত।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত