ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ত মনিপুরী তাঁতশিল্পীরা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৪ মার্চ, ২০২৬
  • ১০৮ বার
ঈদে মনিপুরী তাঁতের চাহিদা বৃদ্ধি

প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল ও জুড়ি উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মনিপুরী, মুসলিম মনিপুরী ও বাঙালি নারীদের পরিচালিত তাঁত শিল্প ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করছে। শাড়ি, চাদর, গামছা, ওড়না সহ বিভিন্ন বস্ত্র তাঁতশিল্পীরা বুনে বাজারে বিক্রি করছেন। শুধু দেশের মধ্যেই নয়, বিদেশেও এই মনিপুরী তাঁতের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে।

মনিপুরী তাঁত শিল্পের কাজ মূলত শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ ও জুড়ি উপজেলায় বেশি হয়ে থাকে। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প এখন নানা সমস্যার মুখোমুখি। যথাযথ পুঁজি ও প্রশিক্ষণের অভাব, বেড়ে যাওয়া সুতার দাম এবং কাপড়ের দাম বৃদ্ধির অনুপাতে ব্যবসায়িক চাপ শিল্পের উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। তাছাড়া মেশিনে তাঁতের কাপড় তৈরি হওয়ায় মান ও গুণগত ক্ষতি হচ্ছে এবং ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন। সরকারি সহায়তা না থাকায় তাঁতশিল্পীরা মহাজন থেকে ঋণ নিয়ে কম দামে কাপড় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

ঈদকে সামনে রেখে তাঁতশিল্পীদের ব্যস্ততা বেড়েছে। কমলগঞ্জ উপজেলার তাঁতশিল্পীরা এ ঈদে ২০ কোটি টাকার কাপড় বিক্রি করবেন বলে আশা করছেন। মনিপুরী শাড়ি সম্প্রতি জিআই পণ্য হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি পাওয়ায় বাজারে এর চাহিদা বেড়েছে।

আদমপুর ইউনিয়নের কোনাগাঁও গ্রামের মুসলিম মনিপুরী তাঁত শিল্পী জুবেদা আক্তার জানান, “শত কষ্টের মধ্যেও তাঁতের কাপড় বুনে সংসার চালাই। এই তাঁত থেকেই আমি মেয়ের বিয়ে করেছি, জমি কিনেছি। নিজের চিকিৎসা খরচসহ পরিবারের খরচ বহন করি। পাশাপাশি অন্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করি।” তিনি বলেন, ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ততা বাড়লেও দাম নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। সরকারি সহযোগিতা বা ঋণ না থাকায় এনজিও ও মহাজনের কাছ থেকে আগাম দাদন নিয়ে পড়তে হয়। মহাজন প্রান্তিক শিল্পীদের ওপর অতিরিক্ত দাম চাপাচ্ছেন, ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তাঁতশিল্পীরা।

মনিপুরী সম্প্রদায়ের মধ্যে শুধুমাত্র জুবেদা আক্তার নয়, অন্যান্য নারী ও পুরুষ তাঁত শিল্পীরাও পরিবারের উপার্জনের জন্য বুনন করছেন। অনেকে পড়ালেখার পাশাপাশি তাঁতে কাজ করে নিজের খরচ ও পরিবারের সহায়তা করছেন। ঈদকে সামনে রেখে তাদের কাজের পরিমাণ বেড়ে গেছে।

কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর, আলীনগর, মাধবপুর ও ইসলামপুর ইউনিয়নে মনিপুরী সম্প্রদায়ের সংখ্যা বেশি। অন্যান্য এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস রয়েছে। আগে সব বাড়িতেই মনিপুরীদের প্রাচীন তাঁতের খটখট শব্দে পাড়া মুখরিত থাকত। তবে এখন বাণিজ্যিকভাবে তাঁত শিল্পের সম্প্রসারণের ফলে মান কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আসল মনিপুরী তাঁতের মান রক্ষা করতে গেলে প্রান্তিক বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া মেশিনে তৈরি কাপড় থেকে সর্তক থাকতে হয়।

ঈদকে সামনে রেখে বেড়েছে সুতার বিক্রিও। মনিপুরী শাড়ি ও কাপড় ব্যবসায়ী শহীদ ও সাইফ উদ্দিন জানান, “ঢাকা, সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা এসে মনিপুরী শাড়ি ক্রয় করে নিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকার কাপড় বিক্রি হচ্ছে। এ বছর শুধুমাত্র কমলগঞ্জ এলাকা থেকে ২০ কোটি টাকার বিক্রি আশা করা হচ্ছে।”

তাঁতশিল্পীরা জানাচ্ছেন, মেশিনে তৈরি মনিপুরী তাঁতের কাপড়ের মান ও গুণ প্রকৃত হাতের কাজের তুলনায় ভিন্ন। প্রকৃত মনিপুরী শাড়ির বুনন সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিশেষ প্যাঠান থাকে, যা কেবল মনিপুরী তাঁতশিল্পীরা তৈরি করেন। ঈদকে সামনে রেখে জেলায় শতকোটি টাকার মনিপুরী তাঁতের শাড়ি ও পণ্য বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে।

এভাবেই মনিপুরী তাঁতশিল্পীরা নিজেদের ঐতিহ্যকে রক্ষা করে ব্যবসা পরিচালনা করছেন, একই সঙ্গে পরিবারের জীবনধারায় আর্থিক সহায়তা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করছেন। ঈদকে সামনে রেখে শিল্পীদের ব্যস্ততা এবং বাজারের চাহিদা বৃদ্ধি এই প্রাচীন শিল্পকে নতুন সম্ভাবনার মুখ দেখাচ্ছে, যদিও মূল সমস্যাগুলো সমাধান না হলে প্রান্তিক শিল্পীরা হুমকির মুখে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com