বাঘের মতোই বিপন্ন টেস্ট ক্রিকেট: কীভাবে রক্ষা পাবে ‘খেলাটার রাজা’?

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩১ জুলাই, ২০২৫
  • ৫৫ বার

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক |একটি বাংলাদেশ অনলাইন

যেমন বাঘকে একসময় পৃথিবীর মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল, ঠিক তেমনি টেস্ট ক্রিকেটকেও ঘিরে আজ রয়েছে অস্তিত্ব সংকট। বিশ্বের ক্রিকেট দর্শকদের কাছে টেস্ট ম্যাচ বহু দশক ধরে ছিল সম্মানের প্রতীক, ধৈর্য ও গভীর কৌশলের মঞ্চ। অথচ আধুনিক সময়ের শর্ট ফরম্যাট এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি ভিত্তিক টি-টোয়েন্টি দুনিয়ার ভিড়ে টেস্ট ক্রিকেট হারাতে বসেছে তার জৌলুস, আবেদন, এমনকি ভবিষ্যৎও।

সম্প্রতি টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক বিশদ সাক্ষাৎকারে ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক ও ধারাভাষ্যকার ডেভিড গাওয়ার টেস্ট ক্রিকেটের টিকে থাকার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন অত্যন্ত আবেগপূর্ণভাবে। তাঁর মতে, ‘যেভাবে বাঘ বিলুপ্তির পথে ছিল এবং “প্রজেক্ট টাইগার”-এর মাধ্যমে তাকে রক্ষা করা হয়েছে, টেস্ট ক্রিকেটের ক্ষেত্রেও তেমন একটি সংগঠিত ও আন্তর্জাতিক প্রয়াস এখন জরুরি।’

গাওয়ারের ভাষায়, “বাঘের মতো সৌন্দর্যময়, চিত্তাকর্ষক আর সম্মানজনক আর কোনো প্রাণী নেই। তেমনি ক্রিকেটেও টেস্টের আবেদন অতুলনীয়। যেভাবে বাঘকে রক্ষার প্রয়াস ছিল ঐক্যবদ্ধ, টেস্ট ক্রিকেটও যদি টিকে থাকতে চায়, তেমন মনোযোগ ও পরিকল্পনা এখন দরকার।”

তাঁর এই বক্তব্য শুধু আবেগ নয়, ক্রিকেট কাঠামোর বর্তমান বৈষম্যের দিকেও ইঙ্গিত করে। গাওয়ার বলেন, “যার কাছে অর্থ, তার কাছেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। এই ব্যবস্থাপনার কারণেই অনেক দেশ টেস্ট খেলতে পারছে না নিয়মিতভাবে। নিউজিল্যান্ডের মতো দল ছোট মাঠে খেললেও টেস্টের আবেদন ধরে রেখেছে। ওদের খেলায় একটা ঐতিহ্য ও আন্তরিকতা থাকে—যা অনেক বড় দেশেও খুঁজে পাওয়া যায় না।”

আইসিসি সম্প্রতি টেস্ট ক্রিকেটকে দুটি স্তরে ভাগ করার একটি প্রস্তাব বিবেচনা করছে, যার সূচনা করেছে ক্রিকেটের বড় তিন পরাশক্তি—অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড এবং ভারত। উদ্দেশ্য, প্রতিযোগিতার ভারসাম্য আনা। যদিও এ নিয়ে এখনও কোন সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে ধারণাটি নিয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এদিকে কিছু বিশ্লেষক পাঁচ দিনের পরিবর্তে চার দিনের টেস্ট ম্যাচ আয়োজনের প্রস্তাবও দিয়েছেন, কিন্তু ক্রিকেট মহলে এ নিয়ে তীব্র বিতর্ক রয়েছে।

ডেভিড গাওয়ার বিশেষভাবে প্রশংসা করেছেন ইংল্যান্ডের বর্তমান টেস্ট অধিনায়ক বেন স্টোকসের নেতৃত্বের। তাঁর মতে, “ইয়ান বোথাম কিংবা অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ দুজনেই দারুণ অলরাউন্ডার ছিলেন, কিন্তু নেতৃত্বে একধরনের অস্বস্তি ছিল। ফ্লিনটফ বিশেষ করে অধিনায়কত্বে মাঠের বাইরের অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু বেন স্টোকস ভিন্ন। তাঁর জীবনসংগ্রাম ও ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো তাকে শিখিয়েছে—নেতৃত্ব কেবল কৌশল নয়, জীবন বোঝার ও সহমর্মিতা প্রকাশ করার ক্ষমতা।”

গাওয়ার বলেন, “স্টোকসকে যদি আপনি ১০ বছর আগে দেখতেন, কখনোই ভাবতেন না এই মানুষ একদিন ইংল্যান্ডের টেস্ট দলকে নতুন দিগন্তে নিয়ে যাবে। ওর জীবনের উত্থান-পতন তাকে ভেতর থেকে বদলে দিয়েছে।”

এই মুহূর্তে স্টোকসের অধীনে ইংল্যান্ড ভারতের সঙ্গে ‘অ্যান্ডারসন–টেন্ডুলকার ট্রফি’ খেলছে। চার ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ড ২–১ ব্যবধানে এগিয়ে আছে। সিরিজের পঞ্চম ও শেষ টেস্ট শুরু হবে আগামীকাল, ঐতিহাসিক ওভাল মাঠে। এই সিরিজ টেস্ট ক্রিকেটের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—যদি তা উপভোগ্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়, তবে দর্শকরা এখনও টেস্টের সৌন্দর্যকে সাদরে গ্রহণ করতে প্রস্তুত।

তবে এই মুহূর্তে প্রশ্ন একটাই—টেস্ট ক্রিকেট কি সত্যিই রক্ষা পাবে? নাকি ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের ব্যবসায়িক ঢেউয়ে একদিন হারিয়ে যাবে ঐতিহ্য আর ইতিহাসের সবচেয়ে মূল্যবান অধ্যায়টি? গাওয়ারের মতো অনেক অভিজ্ঞ ক্রিকেট বিশ্লেষক ও খেলোয়াড়ের আশা, ক্রিকেট প্রশাসকরা যদি টেস্টের আবেদনকে বুঝতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার আনেন, তাহলে হয়তো ইতিহাসের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ফরম্যাটটি আবারও ফিরে পাবে তার স্বর্ণযুগ।

কিন্তু তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু আইসিসির নয়—ভক্ত, খেলোয়াড়, সম্প্রচারমাধ্যম, এবং সব দেশের ক্রিকেট বোর্ডকে নিয়ে একত্রিত হতে হবে টেস্ট ক্রিকেটকে বাঁচানোর প্রকল্পে। অন্যথায়, হয়তো একদিন আমরা টেস্ট ক্রিকেটের কথা বলব—একটি হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের মতো, যেমনভাবে আজ আমরা বিলুপ্তপ্রায় অনেক কিছুকে স্মরণ করি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত