প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন
চার দশক পেরিয়ে গেলেও অলিম্পিক গেমসে বাংলাদেশের পদকশূন্যতা অব্যাহত থাকায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—আসলে পদক জয়ের জন্য দেশের পক্ষ থেকে কোনও সুপরিকল্পিত উদ্যোগ কি নেওয়া হয়েছে? আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যেখানে প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাও অলিম্পিকে পদক এনে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে, সেখানে ১৯৮৪ সাল থেকে অংশগ্রহণ করেও বাংলাদেশ কেন একটিও পদক অর্জন করতে পারেনি, তা নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।
অলিম্পিক মানেই কেবল ক্রীড়ার প্রতিযোগিতা নয়, বরং এটি একটি দেশের ক্রীড়া পরিকাঠামো, বিজ্ঞানচর্চা, এবং সামাজিক অগ্রগতির প্রতিফলনও বটে। বিশ্বের শীর্ষ অলিম্পিক পদকপ্রাপ্ত দেশগুলোর দিকে তাকালেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—তালিকার ওপরের সারিতে অবস্থান করা দেশগুলো উন্নত অর্থনীতি, বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় ক্রীড়া পরিকল্পনার অধিকারী। এই তালিকায় এশিয়ার দেশ হিসেবে চীন ও জাপানের অবস্থানও তাই আশ্চর্যের কিছু নয়। অন্যদিকে বাংলাদেশের ক্রীড়া ক্ষেত্রটি এখনও পরিকল্পনাহীন, পরিকাঠামো-বিচ্ছিন্ন এবং প্রতিযোগিতার অভাবে দুর্বল।
বর্তমান পর্যন্ত ভারত ১০টি স্বর্ণসহ মোট ৪১টি, পাকিস্তান চারটি স্বর্ণসহ ১১টি এবং শ্রীলঙ্কা দুটি অলিম্পিক পদক অর্জন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনও পদকশূন্য। অথচ খেলাধুলা নিয়ে দেশে সাধারণ মানুষের আগ্রহ, উন্মাদনা এবং আবেগের ঘাটতি নেই। সমস্যা মূলত পরিকল্পনার ঘাটতিতে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্রীড়া ক্ষেত্রে সাফল্য আসে ধাপে ধাপে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং বিজ্ঞাননির্ভর প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে। খেলাধুলার ইতিহাসে সফল দেশগুলো কেবল শারীরিক সক্ষমতা বা স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিভার ওপর নির্ভর করেনি—তারা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও ক্রীড়া সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। এই ক্ষেত্রে জাপানকে অনুসরণীয় মডেল হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক দিক থেকে জাপান বাংলাদেশের কাছাকাছি হলেও তারা অলিম্পিকে জিতেছে মোট ৫৭৬টি পদক। ২০২০ সালের টোকিও অলিম্পিকে দেশটি ২৭টি স্বর্ণসহ ৫৮টি এবং ২০২৪ সালে ২০টি স্বর্ণসহ মোট ৪৫টি পদক জিতেছে। এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে তাদের সুসংগঠিত ক্রীড়ানীতি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, এবং গবেষণানির্ভর প্রশিক্ষণব্যবস্থা।
জাপানের ক্রীড়াব্যবস্থার মূল শক্তি এর বিদ্যালয়কেন্দ্রিক ক্রীড়াশিক্ষা। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলাকে পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে শিশুরা শৃঙ্খলা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে নিজেদের প্রস্তুত করে। সেখানে প্রত্যেক স্কুলেই বাধ্যতামূলক ক্রীড়া কার্যক্রম রয়েছে। বেছে নেওয়া হয় সম্ভাবনাময় প্রতিভাদের, যাদের প্রশিক্ষণে রয়েছে বিশেষায়িত কোচ, গবেষণা-ভিত্তিক পরিকল্পনা ও উন্নত প্রযুক্তি সহায়তা। এছাড়া সরকার ও করপোরেট খাত মিলে ক্রীড়াবিদদের পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করে।
বাংলাদেশে এ ধরণের কাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি। দেশে বেশির ভাগ স্কুলে নেই খেলাধুলার পর্যাপ্ত অবকাঠামো, নেই দক্ষ ক্রীড়া প্রশিক্ষক, নেই শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে ক্রীড়ার কার্যকর সংযুক্তি। ফলে যেসব শিশু খেলাধুলায় প্রতিভাবান, তারাও উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে হারিয়ে যায়।
সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের রূপরেখা নির্ধারণ না করা পর্যন্ত বাংলাদেশ অলিম্পিকের মঞ্চে নিজের পতাকা উড়াতে পারবে না। এর জন্য প্রথমেই প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী, বাস্তবভিত্তিক রাষ্ট্রীয় ক্রীড়ানীতি। স্কুলপর্যায়ে বাধ্যতামূলক ক্রীড়াশিক্ষা চালু করে পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও কোচিং সাপোর্ট গড়ে তোলা জরুরি। একইসঙ্গে প্রতিটি বিভাগে একটি করে ক্রীড়া বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, যেখানে সাধারণ শিক্ষা ও ক্রীড়াশিক্ষা একসঙ্গে চলবে।
সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি করপোরেট খাতকেও ক্রীড়ায় সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে—স্কলারশিপ, প্রশিক্ষণ পৃষ্ঠপোষকতা এবং ক্রীড়াবিদদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়ে। বাংলাদেশকে শুরুতেই সব ধরনের খেলায় মনোনিবেশ না করে সম্ভাবনাময় কয়েকটি খেলা যেমন সাঁতার, আরচারি, ভারোত্তোলন বা শ্যুটিংকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা শুরু করা উচিত।
জেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়মিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন, স্কুল পর্যায়ে খেলোয়াড় বাছাই ও অনুশীলনের সুযোগ এবং জাতীয় পর্যায়ে প্রতিভা তুলে ধরার সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলেই অলিম্পিকে বাংলাদেশের উপস্থিতি দৃশ্যমান হতে পারে। শুধুমাত্র ক্রীড়ায় নয়, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হবে শারীরিকভাবে সুস্থ, মানসিকভাবে দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী একটি প্রজন্ম—যারা দেশের গর্ব হবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।
পদক জয়ের স্বপ্ন নিয়ে মুখে মুখে উচ্চারণ করে লাভ নেই, প্রয়োজন পরিকল্পনা, পরিশ্রম এবং পৃষ্ঠপোষকতা। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ক্রীড়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন শুধু সম্মানের বিষয় নয়, বরং জাতীয় মনোবল ও আত্মপরিচয় গঠনের শক্ত ভিত হিসেবেও কাজ করতে পারে। সুতরাং এখনই সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার—বাংলাদেশ কি অলিম্পিক পদকের জন্য প্রস্তুতি নিতে চায়, নাকি আরও দশকজুড়ে শূন্যতা বহন করে চলবে?