প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর চলমান হেনস্তা ও অপমানজনক আচরণের ঘটনায় এবার সরব হলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন। শান্তিনিকেতনে নিজ বাসভবন ‘প্রতীচী’তে ফিরে বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে এই বর্ষীয়ান দার্শনিক ও চিন্তাবিদ বলেন, “বাঙালিদের ওপর যদি অত্যাচার-অবহেলা করা হয়, আমাদের আপত্তি থাকবে। তবে এটা শুধু বাঙালির প্রশ্ন নয়, গোটা ভারতের বিষয়।”
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে যাওয়া শ্রমিকদের ওপর সম্প্রতি মহারাষ্ট্র, গুজরাট, কর্ণাটক, হরিয়ানা ও দিল্লির বিভিন্ন জায়গায় বৈষম্যমূলক আচরণ, ভাষা নিয়ে বিদ্রুপ এবং শারীরিক নিগ্রহের একাধিক অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে। এই ঘটনাগুলো নিয়ে যখন জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে, তখন এই ইস্যুতে স্পষ্ট অবস্থান নিলেন অধ্যাপক সেন।
তিনি বলেন, “হেনস্তার শিকার তিনি বাঙালি হোন, পাঞ্জাবি হোন, কিংবা মাড়োয়ারি হোন—আমাদের আপত্তি করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ, এটা কেবল আঞ্চলিক বা ভাষাগত নিপীড়নের প্রশ্ন নয়; এটা ভারতের সংবিধান, নাগরিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন।”
ভারতের সংবিধানে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে—এই কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে অমর্ত্য সেন বলেন, “ভারতীয় নাগরিকদের অধিকার রয়েছে দেশের সর্বত্র শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করার। সংবিধানে বলা আছে, গোটা দেশের ওপর একজন ভারতীয় নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। সেখানে আঞ্চলিক অধিকারের কোনো পৃথক রূপরেখা নেই। এই কথাটি বুঝতে হবে এবং প্রয়োগে আনতে হবে।”
বাংলা ভাষার অবমাননার বিষয়েও তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন এবং বলেন, “বাংলা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। চর্যাপদ থেকে এর যাত্রা শুরু হলেও পরবর্তীতে এই ভাষায় অসাধারণ সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে অসংখ্য কবি-সাহিত্যিক বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছেন। সেই ভাষার প্রতি যদি অবজ্ঞা বা হেয় করার প্রবণতা দেখা যায়, তাহলে সেটা শুধু বাঙালিদের নয়, গোটা ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক অগ্রগতির বিরুদ্ধে এক প্রকার আঘাত।”
অমর্ত্য সেনের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশের একাধিক রাজ্যে বাংলা ভাষাভাষীদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে হিংসা, বিদ্বেষ ও বৈষম্যের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও ও প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধুমাত্র ভাষাগত পরিচয়ের ভিত্তিতে বাংলাভাষী শ্রমিকদের হুমকি, অপমান এবং কাজ থেকে বরখাস্ত করার ঘটনা বেড়ে গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অমর্ত্য সেনের মতামত কেবল এক জন বাঙালি চিন্তাবিদের প্রতিক্রিয়া নয়, বরং একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নীতিনির্ধারক ও মানবাধিকারপন্থী অর্থনীতিবিদের দৃষ্টিভঙ্গি, যা গোটা ভারতের সাম্যবাদী কাঠামোর ওপর গভীরভাবে প্রশ্ন তোলে।
অমর্ত্য সেন বারবার ভারতে বহুত্ববাদী ও উদারনৈতিক গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলেছেন। তার মতে, ধর্ম, ভাষা, জাতিগত পরিচয় বা আঞ্চলিক পার্থক্য নিয়ে বিভাজনের রাজনীতি ভারতীয় গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে। এদিনও তার ভাষণে সেই আদর্শেরই প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়।
শিক্ষাবিদ ও সমাজচিন্তকদের মতে, এখন সময় এসেছে ভাষা ও আঞ্চলিক বৈচিত্র্যকে সম্মান জানিয়ে সমন্বয়ের ভারত গড়ার। অন্যথায়, সাম্প্রতিক প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও একতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। এ প্রসঙ্গে অমর্ত্য সেনের মতো ব্যক্তিত্বের সরব হওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও নৈতিক বার্তা বয়ে আনছে। তাঁর ভাষ্যে বারবার উঠে আসে—ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার মর্যাদা নিশ্চিত করেই গড়ে উঠতে পারে একটি ন্যায্য ও মানবিক সমাজ।
পরিস্কারভাবে বলা যায়, অধ্যাপক সেনের বক্তব্য শুধু একজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদের দৃষ্টিকোণ নয়, বরং ভারতের বহুত্ববাদী চেতনার পক্ষের এক নির্ভীক উচ্চারণ, যা আজকের দিনে আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী।