কানাডায় আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে ইসলাম বিদ্বেষ ও ঘৃণাজনিত অপরাধ, ফিলিস্তিনপন্থী কানাডিয়ানদের বিরুদ্ধে বাড়ছে বৈষম্য

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৭ আগস্ট, ২০২৫
  • ৩৪ বার

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে কানাডায় অভূতপূর্ব হারে বৃদ্ধি পেয়েছে ইসলাম বিদ্বেষ ও ঘৃণাজনিত অপরাধ বা ‘হেইট ক্রাইম’। সম্প্রতি ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামোফোবিয়া রিসার্চ হাবের প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত ২১ মাসে দেশটিতে মুসলিম ও আরব সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বৈষম্য, সহিংসতা ও সামাজিক বর্জনের ঘটনা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। এ বৃদ্ধি কখনো কখনো ১,৮০০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা কানাডার বহুত্ববাদী সমাজ কাঠামোর জন্য একটি গুরুতর হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. নাদিয়া হাসান কর্তৃক প্রস্তুত ‘Documenting the Palestine Exception’ শিরোনামের এই গবেষণা প্রতিবেদনটি ১৬টি কানাডীয় সামাজিক সংগঠনের পরামর্শ, সরকারি পরিসংখ্যান ও সংবাদমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে। এতে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় ইসরাইলি হামলা শুরুর পর থেকে কানাডায় ইসলামবিদ্বেষ, ফিলিস্তিন-বিরোধী বর্ণবাদ এবং আরব-বিরোধী মনোভাবের দ্রুত বিস্তারের চিত্র ফুটে উঠেছে।

প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে অটোয়ায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ড. নাদিয়া হাসান বলেন, “২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে কানাডায় মুসলিম ও আরব সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাবের ভয়ানক বিস্তার ঘটেছে। এটি শুধু মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় আঘাত হানছে না, বরং চাকরি, শিক্ষা এবং সামাজিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে।” তিনি আরো বলেন, “এই প্রতিবেদন বাস্তব পরিস্থিতির মাত্র একটি খণ্ডাংশ তুলে ধরেছে। বাস্তব চিত্র আরও জটিল ও গভীর।”

স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে মুসলিম-বিরোধী ঘৃণাজনিত অপরাধ ৯৪ শতাংশ বেড়েছে এবং আরব বা পশ্চিম এশীয়দের বিরুদ্ধে ঘৃণা-ভিত্তিক অপরাধ বেড়েছে ৫২ শতাংশ। অন্যদিকে, ন্যাশনাল কাউন্সিল অব কানাডিয়ান মুসলিমস (NCCM) জানিয়েছে, গাজা যুদ্ধ শুরুর পরের মাসেই ইসলামবিদ্বেষ ১,৩০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পরের বছরের মধ্যভাগে এসে ১,৮০০ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে।

চরম উদ্বেগজনক আরেকটি তথ্য দিয়েছে মুসলিম লিগ্যাল সাপোর্ট সেন্টার, যারা ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত সময়কালে ৪৭৪টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পেয়েছে। এর মধ্যে ৩৪৫ জন কানাডিয়ান নাগরিক বা অভিবাসী ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন জানানোয় চাকরি হারিয়েছেন বা ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, লিগ্যাল সেন্টার ফর প্যালেস্টাইন জানিয়েছে, আট মাসে ফিলিস্তিন-বিরোধী বর্ণবাদের মামলা বেড়েছে ৬০০ শতাংশ।

এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে কানাডায় ইসলাম বিদ্বেষ ও ফিলিস্তিন-বিরোধী বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিযুক্ত বিশেষ প্রতিনিধি আমিরা এলঘাওয়াবি কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “ফিলিস্তিনের মানবাধিকার রক্ষায় কণ্ঠ তোলায় মানুষকে চাকরি হারাতে হচ্ছে, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে—এটি শুধু অবিচার নয়, এটি আমাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে স্পষ্ট হুমকি।”

এলঘাওয়াবি আরও বলেন, “৯/১১-পরবর্তী সময়ের পুরনো বর্ণবাদী অপপ্রচার আজ আবার নতুন করে ফিরছে, যার পেছনে রয়েছে অতি-ডানপন্থী গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক মদত। এর ফলে কানাডার ফিলিস্তিন-মুসলিম এবং আরব-অভিবাসীদের সম্প্রদায় চরম অবমাননার শিকার হচ্ছে। এ ধরনের বিদ্বেষ আর দীর্ঘস্থায়ী হলে তা কানাডার মানবাধিকার কাঠামোকে দুর্বল করে দেবে।”

প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে আহ্বান জানানো হয়েছে, কানাডায় ফিলিস্তিনি-বিরোধী বর্ণবাদের একটি স্বীকৃত সংজ্ঞা প্রণয়ন, হেইট ক্রাইমের জন্য উপযুক্ত আইনগত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, এবং স্কুল ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে এই নতুন হুমকির প্রতিক্রিয়ায় স্বাধীন তদন্ত চালু করার। গবেষণাটিতে এসব পদক্ষেপকে অবিলম্বে বাস্তবায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কানাডার বহুসাংস্কৃতিক সমাজব্যবস্থার মধ্যে এই ধরনের বিদ্বেষমূলক প্রবণতা অত্যন্ত বিপজ্জনক। যদিও দেশটির সংবিধান মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, বাস্তবতা বলছে, একদল নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আরেক দলের উপর নিপীড়নের হাতিয়ার হয়ে উঠছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, কানাডা কি সত্যিই তার উদারনৈতিক মূল্যবোধ রক্ষা করতে পারছে? সমাজের প্রতিটি স্তরে—শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, বিচার ও প্রশাসনে—এই প্রশ্নের উত্তর এখন মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। ইসলাম বিদ্বেষ ও ফিলিস্তিন বিরোধী বর্ণবাদ এখন আর নিছক মতবাদের প্রশ্ন নয়, এটি হয়ে উঠেছে একটি মানবাধিকার সংকট। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত প্রতিরোধ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত