প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ‘ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে স্থাপিত দেশের বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হলেও এর যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে থমকে আছে। ২০২১ সালে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক স্থাপনের জন্য সরকার একটি বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করে, যা ২০২২ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে প্লট বুঝিয়ে দিতে দেরি হওয়ায় এখনো প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি, এবং চতুর্থবারের মতো এর মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন ও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) সূত্রে জানা যায়, প্লট হস্তান্তরে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) দেরিই প্রকল্প বিলম্বের অন্যতম প্রধান কারণ। শুরুতে এই দেরির কারণে কাজ হাতে নেওয়া সম্ভব হয়নি, ফলে প্রকল্পের মেয়াদ ইতিমধ্যে তিনবার বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। বিটিসিএল আরও জানায়, করোনা মহামারির সময়ে অর্থছাড় সীমিত থাকায় প্রথম দুই অর্থবছরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ভবন নির্মাণে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সময়মতো কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়, যা প্রকল্প বিলম্বকে আরও ত্বরান্বিত করে।
প্রকল্পে বিলম্বের আরেকটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে নতুন আর্থিক নিয়মকানুন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অনলাইনে আইবাসের মাধ্যমে সিডি-ভ্যাট পরিশোধের নতুন বিধান কার্যকর হওয়ায় জটিলতা দেখা দেয়, যা নিরসনে সময়ক্ষেপণ হয়। এই বিলম্বের ফলে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, এবং গত ১৬ ফেব্রুয়ারি অর্থ বিভাগে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় প্রকল্পের মেয়াদ আরও বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর সুপারিশ করলেও শর্ত দিয়েছে যে, এই বর্ধিত সময়ের মধ্যেই সব কাজ শেষ করতে হবে এবং এরপর আর কোনো মেয়াদ বাড়ানো হবে না। একই সঙ্গে আইএমইডি প্লট হস্তান্তরে বিলম্বের বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছে। সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, টেলিযোগাযোগ ভবন নির্মাণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলেও পিপিআর-২০০৮ অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, যা স্পষ্টীকরণ প্রয়োজন।
মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল ২০১৬ সালে উদ্বোধন করা হয় এবং ২০১৭ সালের এপ্রিলে জমি বরাদ্দের আবেদন গ্রহণ শুরু হয়। ২০১৮ সালে এর নাম পরিবর্তন করে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর’ রাখা হয়। এই জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি ১২টি পৃথক জোনে বিভক্ত, যার মধ্যে রয়েছে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল, বিজিএমইএ পোশাক শিল্পপার্ক, ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং এসবিজি গ্রুপ অর্থনৈতিক অঞ্চল। বেজার হিসাব অনুযায়ী, পুরো শিল্পনগর চালু হলে আগামী ১৫ বছরে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে এবং প্রতিবছর রপ্তানি আয় হবে প্রায় ১,৫০০ কোটি ডলার।
তবে এই সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক অঞ্চলের টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্প দীর্ঘসূত্রিতার কারণে বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে। শিল্প ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে দ্রুত যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন অপরিহার্য হলেও প্লট হস্তান্তরের মতো মৌলিক কাজে দেরি সামগ্রিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
উল্লেখযোগ্য যে, সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম বাদ দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। গাজীপুরের কবিরপুরে অবস্থিত দেশের সর্ববৃহৎ ফিল্ম সিটির নাম সম্প্রতি পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ ফিল্ম সিটি’ রাখা হয়েছে, যা আগে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ফিল্ম সিটি’ নামে পরিচিত ছিল। যদিও এ পরিবর্তন সরাসরি মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রকল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, তবুও নাম পরিবর্তন ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের এই ধারাবাহিকতা দেশের অর্থনৈতিক ও শিল্প খাতের নীতি ও পরিকল্পনার প্রেক্ষাপটে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এই প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি সত্ত্বেও সময়মতো কাজ শেষ করা সম্ভব হবে কিনা, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে পরিকল্পনা কমিশন ও আইএমইডি উভয়েই ইঙ্গিত দিয়েছে যে, আর কোনো বিলম্বের সুযোগ নেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের মতো একটি কৌশলগত শিল্পাঞ্চলের টেলিযোগাযোগ উন্নয়ন কি শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হবে, নাকি আবারও প্রশাসনিক জটিলতা ও বাস্তবায়ন ঘাটতি এর অগ্রগতি ব্যাহত করবে।