কলকাতায় কারমাইকেল হোস্টেলের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, ‘বাংলাদেশি-রোহিঙ্গা’ তকমা ঘিরে উত্তেজনা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২১ আগস্ট, ২০২৫
  • ২৬ বার

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

কলকাতায় আবারও বাঙালি মুসলিম শিক্ষার্থীদের ওপর বৈষম্যমূলক হামলার অভিযোগ উঠেছে। ঐতিহাসিক কারমাইকেল হোস্টেলের কয়েকজন শিক্ষার্থী বুধবার রাতে কেনাকাটায় গিয়ে পরিচয়কে ঘিরে বিদ্বেষের শিকার হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, শিক্ষার্থীদের ‘বাংলাদেশি’ ও ‘রোহিঙ্গা’ তকমা দিয়ে কটূক্তি করা হয় এবং পরবর্তীতে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। ঘটনায় অন্তত সাতজন গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যাদের শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বুধবার রাত সাড়ে দশটার দিকে কারমাইকেল হোস্টেলের কয়েকজন আবাসিক শিয়ালদহের শিশির মার্কেটে যান। তারা মোবাইলের কাভার কিনতে দোকানে ঢুকলেও পছন্দ না হওয়ায় কোনো জিনিস না নিয়েই বেরিয়ে আসছিলেন। ঠিক সেই সময় এক দোকানদার ও তার সহযোগীরা হিন্দিতে অবমাননাকর মন্তব্য শুরু করে। অভিযুক্তরা শিক্ষার্থীদের ‘বাংলাদেশি’, ‘রোহিঙ্গা’, ‘কাটুয়া’ ও ‘মোল্লা’ বলে কটূক্তি করে এবং বিদ্বেষমূলক ভাষায় বলে, মুসলমানরা কেবল দোকানে আসে দেখার জন্য, কেনার জন্য নয়।

এই মন্তব্যের প্রতিবাদ করলে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, দোকানদার ও তার সহযোগীরা প্রথমে তিন থেকে চারজন শিক্ষার্থীকে বেধড়ক মারধর করে, পরে আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী এগিয়ে এলে তাদের ওপরও হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা ছুরি, লাঠি, রড, হকি স্টিক এমনকি আগ্নেয়াস্ত্র পর্যন্ত ব্যবহার করেছে বলে দাবি করেছেন আহতরা। গুরুতর আহত সাতজনকে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যেখানে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন তাদের শরীরের গলা, গাল ও পিঠে ধারালো অস্ত্রের চিহ্ন রয়েছে।

ঘটনার পর কারমাইকেল হোস্টেলের শিক্ষার্থীরা রাতেই মুচিপাড়া থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে যায় এবং ইতোমধ্যেই দুইজনকে আটক করেছে। বাকিদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে কলকাতা পুলিশ। তবে রাত থেকে ভোর পর্যন্ত থানার সামনে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

এ ঘটনার পর রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনগুলোও সরব হয়েছে। তৃণমূল ছাত্র পরিষদের অভিরূপ চক্রবর্তী, এসএফআইয়ের সাবেক রাজ্য সভাপতি প্রতীক উর রহমান, বর্তমান রাজ্য সম্পাদক দেবাঞ্জন দে এবং বাংলা পক্ষের মুখপাত্র গর্গ চট্টোপাধ্যায় মুচিপাড়া থানায় গিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, এই ধরনের হামলা শুধু শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা সংকট তৈরি করছে না, বরং সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে উসকে দিচ্ছে।

হোস্টেলের সাবেক শিক্ষার্থীরাও বর্তমান আবাসিকদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অনেকেই আইনি সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। কলকাতার বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ইতিমধ্যেই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের ওপর এই হামলা কেবল ব্যক্তিগত বা দোকানসংক্রান্ত বিরোধ নয়, বরং এটি পরিকল্পিতভাবে পরিচয়-রাজনীতিকে ব্যবহার করে মুসলিম শিক্ষার্থীদের লক্ষ্যবস্তু বানানোর একটি উদাহরণ।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং হোস্টেল সুপারের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, প্রশাসনের নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তাদের হুঁশিয়ারি, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।

স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এ ধরনের হামলা শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতির পরিবেশ তৈরি করছে না, বরং বহিরাগত পরিচয়ের প্রশ্নে শহরের সমাজ-রাজনীতিকেও আলোড়িত করছে। বিশেষত ‘বাংলাদেশি’ ও ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয় ব্যবহার করে আক্রমণ চালানোকে অনেকেই একটি বিপজ্জনক প্রবণতা হিসেবে দেখছেন, যা সাম্প্রদায়িক সহাবস্থানের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

বর্তমানে আহত শিক্ষার্থীরা চিকিৎসাধীন, আর তাদের সহপাঠীরা দোষীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবিতে সরব রয়েছেন। কলকাতা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তদন্তে কোনো প্রভাব খাটানো হবে না এবং দোষীরা যত প্রভাবশালীই হোক, তাদের আইনের মুখোমুখি করা হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত