প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ঢাকার সকাল সবে ফুটেছে। ভোর সাড়ে পাঁচটায় যখন শহর এখনো ঘুমঘুম, তখন বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনার পাশে এসে দাঁড়াল একটি বাস। ভেতর থেকে নামতে লাগল একঝাঁক কিশোরী থেকে তরুণীর পথে পা বাড়ানো স্বপ্নবাজ মেয়েরা। কারো কাঁধে বুট ঝোলানো, কারো মাথায় বেণী বাঁধা চুল, কিন্তু সবার চোখেমুখে একটাই প্রতিশ্রুতি—বাংলাদেশের নারী ফুটবলের ইতিহাসকে নতুনভাবে লিখে দেওয়ার অঙ্গীকার।
এই মেয়েরা এখন দেশের গর্ব, কারণ তাদের হাত ধরেই বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো পা রেখেছে এএফসি এশিয়ান কাপের মূল পর্বে। নেতৃত্বের ভার কাঁধে তুলে নিয়েছেন আঠারো বছর বয়সী রক্ষণভাগের খেলোয়াড় আফঈদা খন্দকার। শান্তশিষ্ট কিন্তু দুর্দমনীয় সাহসী মনের অধিকারী আফঈদার নেতৃত্বেই একটি এলোমেলো দল গড়ে উঠেছে শৃঙ্খলাবদ্ধ শক্তি হিসেবে। বাছাইপর্বে বাহরাইনকে ৭-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর শক্তিশালী মিয়ানমারকে ২-১ গোলে হারিয়ে এবং তুর্কমেনিস্তানকে ৭-০ গোলে বিধ্বস্ত করে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে তারা জায়গা করে নিয়েছে মূল মঞ্চে। তিন ম্যাচে ১৬ গোলের বিপরীতে হজম করেছে মাত্র একটি।
এই অর্জনের পর বাংলাদেশের মেয়েরা এখন শুধু এশিয়া নয়, বিশ্ব ফুটবলের কাছেও আলোচনার বিষয়। ফিফা র্যাংকিংয়েও এসেছে বড় পরিবর্তন। এক লাফে ২৪ ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশ উঠে এসেছে ১০৪ নম্বরে, যা সাম্প্রতিক র্যাংকিংয়ে সবচেয়ে বড় উন্নতি হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। আফঈদা বললেন, “এই অর্জন শুধু আমাদের নয়, এটা বাংলাদেশের প্রতিটি মেয়ের, যারা স্বপ্ন দেখতে সাহস করে। অধ্যবসায় আর একতা দিয়ে কী অর্জন সম্ভব, আমরা তার প্রমাণ। তবে এখানেই থামতে চাই না, আরও কঠিন চ্যালেঞ্জের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি।”
সাতক্ষীরার মেয়ে আফঈদার ফুটবলযাত্রার গল্পও অনুপ্রেরণাদায়ী। তার বাবা নিজেও একসময় জেলা পর্যায়ের ফুটবলার ছিলেন, কিন্তু সংসারের দায়ে স্বপ্ন পূরণ হয়নি। বিদেশে কাজ করে ফিরে এসে স্থানীয় শিশুদের জন্য একটি ফুটবল একাডেমি গড়ে তোলেন। সেখানেই বেড়ে ওঠেন আফঈদা ও তার বড় বোন আফরা। আফঈদা ফুটবলে টিকে থাকলেও আফরা বেছে নিয়েছেন বক্সিং। জাতীয় পর্যায়ের চ্যাম্পিয়নশিপে এখন তিনি দেশের হয়ে খেলছেন।
নারী ফুটবলের এই নবজাগরণ শুধু খেলোয়াড়দের অধ্যবসায় নয়, কোচ পিটার বাটলারের কৌশলগত পরিকল্পনারও ফল। ব্রিটিশ এই প্রশিক্ষক মেয়েদের ভেতরে এমন আত্মবিশ্বাস জাগিয়েছেন যে তারা এখন চোখ রাখছে বিশ্বকাপ ও অলিম্পিক গেমসে খেলার স্বপ্নে। আগামী বছর জাপান, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে মাঠে নামবে বাংলাদেশ। সেখানে সেরা হওয়ার লড়াইয়ে জয়ী হলে তাদের সামনে খুলে যেতে পারে বিশ্বকাপের দরজা, যা দেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে নতুন এক মাইলফলক হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের নারী ফুটবলের এই সাফল্য কেবল খেলার গণ্ডি পেরিয়ে গেছে। এটি সমাজে নারীর ক্ষমতায়নের প্রতীক হয়ে উঠেছে, যেখানে মেয়েরা সাহস করে নিজেদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে। একসময় অবহেলিত এই খেলার আসন এখন জাতীয় গর্বের জায়গায়। নারী ফুটবলের এই নবজাগরণ তাই শুধু মাঠের নয়, এটি গোটা জাতির আশা ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক।