প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে দেশের জন্য এক বিশাল পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। অন্তর্বর্তী সরকার দেশের বৈদেশিক বিনিয়োগকে কেন্দ্র করে ৬০ হাজার কোটি টাকার ৫৫টি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল। এটি পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের ক্ষমতার একটি প্রকল্প, যা দেশের শক্তিশালী এবং পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে ধরা হয়। তবে দরপত্র আহ্বানের পর আশানুরূপ সাড়া না পাওয়ায় প্রকল্পের বাস্তবায়ন স্থগিত হওয়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত চারটি প্যাকেজে এই ৫৫টি কেন্দ্রের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। প্রথম ধাপে দরপত্রে তেমন সাড়া পড়েনি। দ্বিতীয় ধাপেও ১০টি কেন্দ্রের জন্য মাত্র ২১টি দরপত্র জমা পড়েছে। পরিস্থিতির কারণে দরপত্রের সময়সীমা পাঁচবার বাড়ানো হয়েছে, সর্বশেষ খোলার নির্ধারিত তারিখ ছিল ১৮ জুন।
সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী, ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্রের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক টার্নওভার চাওয়া হয়েছে ৮ দশমিক ২০ মিলিয়ন ডলার, ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ৫৭ দশমিক ২০ মিলিয়ন ডলার এবং প্রতি মেগাওয়াটের জন্য পাঁচ হাজার ডলার টেন্ডার সিকিউরিটি দিতে হবে। এছাড়া কেন্দ্র স্থাপনের জন্য স্থানীয় এসিল্যান্ড এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক।
দরপত্র নথি অনুযায়ী, এককভাবে ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড বিভিন্ন ক্ষমতার ২৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দরপত্র জমা দিয়েছে, যা সবচেয়ে বেশি। দেশ এনার্জি ৯টি, কনফিডেন্স সাতটি, বারাকা ছয়টি এবং মীর পাঁচটি কেন্দ্রের জন্য দরপত্র দিয়েছে। বিভিন্ন প্ল্যান্টের জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিয়েছে, তবে কিছু কেন্দ্রের জন্য একমাত্র দরদাতার হাতেই দরপত্র এসেছে।
বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশি বিনিয়োগের অনিশ্চয়তার কারণে নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের আগ্রহ কমে গেছে। এছাড়া জমির মালিকানা এবং স্থানীয় ছাড়পত্রের শর্তগুলো কঠোর থাকায় দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নানা বাধার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিদেশি অংশের জন্য ৭০ শতাংশ অর্থ ডলারে এবং ৩০ শতাংশ বাংলাদেশি টাকায় পরিশোধের শর্ত থাকলেও মুদ্রাস্ফীতি সমন্বয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, “প্রকল্পে অবশ্যই বিদেশি অর্থায়ন প্রয়োজন হবে। বিনিয়োগকারীরা গ্যারান্টি পেলে তবেই অর্থায়ন করবে। এটি সঠিকভাবে তদারকি করা জরুরি।”
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, “দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় সৌরবিদ্যুৎ অপরিহার্য। বৈদেশিক জ্বালানি আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়বহুল হয়ে যাচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎই আমাদের বিকল্প শক্তি।”
বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শহিদুল ইসলাম বলেন, “দেশীয় ব্যাংকগুলোর ঋণদান ক্ষমতা সীমিত, তাই বিদেশি অর্থায়নকে গুরুত্ব দিতে হবে। বিনিয়োগের প্রক্রিয়া সহজ ও সাবলীল করতে নীতিগত পরিবর্তন জরুরি।”
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানান, “অনেক কোম্পানি দরপত্রে অংশ নিয়েছে। ইভ্যালুয়েশনের কাজ শুরু হয়েছে। একাধিক কমিটি স্বতন্ত্রভাবে দরপত্র যাচাই করছে। তাদের কাজ শেষ হলে ফাইন্যান্সিয়াল কমিটি কাজ শুরু করবে। যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে বলে আশা করছি।”
দেশে সৌরবিদ্যুতের প্রসার শুধু বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নয়, বরং জ্বালানি ব্যয় হ্রাস, পরিবেশবান্ধব শক্তি উৎপাদন এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে দরপত্রে অংশগ্রহণের সীমিত সংখ্যা, অর্থায়নের অনিশ্চয়তা এবং নীতিগত বাধার কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে এখন অনিশ্চয়তার ছায়া কেটে যায়নি। সরকারের দৃঢ় ও কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া দেশের এই দীর্ঘমেয়াদী শক্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।